একটি কোষ থেকে সম্পূর্ণ প্রাণী: ১৪ লক্ষ কোষ বিশ্লেষণ করে ভ্রূণের বিকাশের মানচিত্র তৈরি
একটি নিষিক্ত ডিম্বাণু কীভাবে বিভাজিত হতে হতে তৈরি করে মস্তিষ্ক, হৃদ্যন্ত্র, স্নায়ুতন্ত্র এবং শরীরের শত শত ধরনের কোষ? এই রহস্যের আরও গভীরে পৌঁছতে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি করলেন MIT ও Whitehead Institute-এর গবেষকেরা। ইঁদুরের ভ্রূণের ১৪ লক্ষেরও বেশি কোষ বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা তৈরি করেছেন কোষের বংশপরিচয় ও বিকাশের একটি বিস্তারিত মানচিত্র। ২০২৬ সালের ৮ অক্টোবর Cell জার্নালে প্রকাশিত এই গবেষণা ভ্রূণের বিকাশ, জন্মগত ত্রুটি, ক্যানসার এবং স্টেম সেল গবেষণার নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে।
ভ্রূণের বিকাশের সময় কোষ শুধু সংখ্যায় বাড়ে না, তাদের পরিচয় ও কাজও বদলে যায়। প্রাথমিক পর্যায়ের কোষগুলি পরবর্তী সময়ে নির্দিষ্ট সংকেত এবং জিনের কার্যকলাপের প্রভাবে বিশেষায়িত কোষে পরিণত হয়। কেউ স্নায়ুকোষ তৈরি করে, কেউ পেশি বা রক্তকোষের বৈশিষ্ট্য অর্জন করে, আবার অন্য কোষগুলি বিভিন্ন অঙ্গ গঠনে অংশ নেয়। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় কোষের বিভেদন (Cell Differentiation)। কোন কোষ থেকে কোন কোষের জন্ম হচ্ছে, কখন তার বিকাশের পথ নির্দিষ্ট হচ্ছে এবং শেষ পর্যন্ত শরীরের কোথায় সে অবদান রাখছে—এই তথ্যগুলি একসঙ্গে বিশ্লেষণ করাই নতুন গবেষণার মূল উদ্দেশ্য।

এই কাজের জন্য গবেষকেরা ব্যবহার করেছেন PEtracer নামে একটি প্রযুক্তি। এটি কোষের DNA-তে ছোট, বংশগতভাবে সংরক্ষিত পরিবর্তন তৈরি করে, যা কোষ বিভাজনের পর তার বংশধর কোষগুলিতেও চিহ্ন হিসেবে থেকে যায়। পরে এই পরিবর্তন বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা পুনর্গঠন করতে পারেন কোন কোষগুলি একই পূর্বপুরুষ কোষ থেকে এসেছে। বিষয়টিকে একটি পারিবারিক বংশলতিকার সঙ্গে তুলনা করা যায়। গবেষকেরা এই বংশগত তথ্যের সঙ্গে প্রতিটি কোষে কোন জিন সক্রিয় রয়েছে এবং ভ্রূণের কোথায় কোষটি অবস্থান করছে, সেই তথ্যও যুক্ত করেছেন। বিভিন্ন বিকাশপর্বের ভ্রূণ বিশ্লেষণ করে তাঁরা কোষের ইতিহাস, অবস্থান এবং ভবিষ্যৎ পরিচয়ের মধ্যে সম্পর্ক খুঁজেছেন।
এই মানচিত্রের গুরুত্ব শুধু কোষের বংশপরিচয় জানার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি বিজ্ঞানীদের বুঝতে সাহায্য করতে পারে, ভ্রূণের বিকাশের কোন পর্যায়ে কোষ একটি নির্দিষ্ট কলা বা অঙ্গ তৈরির পথে এগিয়ে যায়। স্বাভাবিক বিকাশের এই ধারাবাহিকতা জানা থাকলে জন্মগত ত্রুটির ক্ষেত্রে কোন পর্যায়ে সমস্যা দেখা দিয়েছে, তা অনুসন্ধান করা সহজ হতে পারে। একই পদ্ধতি ক্যানসার গবেষণাতেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে। ক্যানসার কোষ সময়ের সঙ্গে এমন বৈশিষ্ট্য অর্জন করতে পারে, যা তাকে শরীরের অন্য অংশে ছড়িয়ে পড়তে বা চিকিৎসার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সাহায্য করে। কোষের বংশপরিচয় ও পরিবর্তনের ইতিহাস বিশ্লেষণ করে ভবিষ্যতে এই বৈশিষ্ট্যগুলি কখন এবং কীভাবে তৈরি হয়, তা আরও ভালোভাবে বোঝা সম্ভব হতে পারে।
স্টেম সেল গবেষণার ক্ষেত্রেও এই আবিষ্কার গুরুত্বপূর্ণ। স্টেম সেলকে গবেষণাগারে নির্দিষ্ট ধরনের কার্যকর কোষে রূপান্তরিত করার চেষ্টা চলছে, কিন্তু ভ্রূণের মধ্যে স্বাভাবিকভাবে ঘটে যাওয়া প্রতিটি ধাপ হুবহু অনুকরণ করা কঠিন। নতুন মানচিত্র কোষের বিকাশের ক্রম এবং তাদের বিশেষায়িত হয়ে ওঠার প্রক্রিয়া সম্পর্কে আরও বিস্তারিত ধারণা দিতে পারে। এর সাহায্যে ভবিষ্যতে স্নায়ুকোষ, হৃদ্যন্ত্রের পেশিকোষ বা অন্য কোষ তৈরির পদ্ধতি উন্নত করার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এই গবেষণা এখনও সরাসরি কোনও নতুন চিকিৎসা পদ্ধতি প্রতিষ্ঠা করেনি।
গবেষণাটির একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা হল, পরীক্ষাগুলি ইঁদুরের ভ্রূণে করা হয়েছে। মানুষের ভ্রূণের বিকাশে একই প্রক্রিয়া কতটা কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা যাবে, তা বুঝতে আরও গবেষণা প্রয়োজন। একই সময়ে Science জার্নালেও ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা DNA Typewriter নামে একটি সম্পর্কিত প্রযুক্তি ব্যবহার করে ইঁদুরের ভ্রূণে কোষের বিভাজন-ইতিহাস অনুসরণের গবেষণা প্রকাশ করেছেন। দুটি কাজই দেখায়, কোষের বর্তমান পরিচয়ের পাশাপাশি তার অতীতের ইতিহাস জানা জীববিজ্ঞানের জটিল প্রশ্নগুলির উত্তর খুঁজতে সাহায্য করতে পারে। ভবিষ্যতে এই ধরনের প্রযুক্তি আরও উন্নত হলে ভ্রূণের বিকাশ, জন্মগত ত্রুটি এবং ক্যানসারের মতো রোগের উৎপত্তি সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের ধারণা আরও গভীর হতে পারে।
তথ্যসূত্র: MIT News, Whitehead Institute এবং Cell জার্নালে প্রকাশিত গবেষণা।