জলবায়ু পরিবর্তনকে বিশ্বজনস্বাস্থ্যের জরুরি অবস্থা ঘোষণার দাবি ১৪৬ বিশেষজ্ঞের
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এখন আর শুধু বরফ গলা, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি কিংবা চরম আবহাওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। ক্রমবর্ধমান তাপপ্রবাহ মানুষের শরীর, কর্মক্ষমতা এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার উপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে। প্রচণ্ড গরমে কাজের সময় কমছে, হাসপাতালের উপর চাপ বাড়ছে এবং তাপজনিত মৃত্যুর বোঝা আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। এই পরিস্থিতিতে জলবায়ু পরিবর্তনকে শুধু পরিবেশগত সংকট হিসেবে দেখার পরিবর্তে বিশ্বজনস্বাস্থ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করার দাবি জোরালো হচ্ছে।
২০২৬ সালের ২৮ অক্টোবর প্রকাশিত ScienceAlert-এর একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, The Lancet Countdown on Health and Climate Change-এর সর্বশেষ মূল্যায়নের প্রেক্ষিতে ১৪৬ জন বিশেষজ্ঞ জলবায়ু পরিবর্তনকে আনুষ্ঠানিকভাবে বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁদের বক্তব্য, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে স্বাস্থ্যের উপর যে ক্ষতিকর প্রভাব বাড়ছে, আন্তর্জাতিক পদক্ষেপ তার সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না। পরিচ্ছন্ন শক্তির প্রসার এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রস্তুতির মতো ক্ষেত্রে অগ্রগতি হলেও, ঝুঁকি মোকাবিলায় আরও দ্রুত ও বিস্তৃত উদ্যোগ প্রয়োজন।
এই পরিস্থিতির গুরুত্ব বোঝার জন্য জলবায়ু পরিবর্তন ও মানুষের শরীরের সম্পর্কটি জানা জরুরি। মানবদেহ ঘাম এবং অন্যান্য শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে। কিন্তু পরিবেশের তাপমাত্রা অত্যধিক বেড়ে গেলে শরীরের পক্ষে অতিরিক্ত তাপ বের করে দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। দীর্ঘ সময় প্রচণ্ড গরমে থাকলে অসুস্থতার ঝুঁকি বাড়ে, বিশেষত যাঁদের খোলা জায়গায় শারীরিক পরিশ্রম করতে হয়। কৃষি ও নির্মাণশিল্পের মতো ক্ষেত্রে কর্মরত মানুষের কাজের পরিবেশ আবহাওয়ার উপর সরাসরি নির্ভরশীল। ফলে তাপপ্রবাহ শুধু স্বাস্থ্যের ক্ষতি করে না, জীবিকা ও উৎপাদনশীলতাকেও প্রভাবিত করে।

The Lancet Countdown গত এক দশক ধরে জলবায়ু পরিবর্তন ও মানুষের স্বাস্থ্যের সম্পর্ক পর্যবেক্ষণ করে আসছে। জনস্বাস্থ্য, জলবায়ুবিজ্ঞান, শক্তি, অর্থনীতি এবং তথ্যবিশ্লেষণ-সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রের বিশেষজ্ঞেরা এই উদ্যোগে যুক্ত। তাঁদের মূল্যায়নে স্বাস্থ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত ৫৪টি সূচক পর্যবেক্ষণ করা হয়। এর মাধ্যমে জলবায়ুজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি কীভাবে বদলাচ্ছে, বিভিন্ন দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা কতটা প্রস্তুত এবং প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপের সুফল কতদূর পৌঁছচ্ছে, তা বোঝার চেষ্টা করা হয়।
প্রতিবেদনে উঠে আসা সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্যগুলির একটি হল তাপজনিত মৃত্যুর সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের সম্পর্ক। গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ সালে বিশ্বজুড়ে তাপের সঙ্গে সম্পর্কিত আনুমানিক ৭ লক্ষ ১০ হাজার মৃত্যুর মধ্যে ৭১.৫ শতাংশকে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন না ঘটলে এই মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় ২ লক্ষের কাছাকাছি থাকত বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এই পরিসংখ্যান সরাসরি প্রতিটি মৃত্যুর কারণ নির্ধারণ করে তৈরি নয়; বরং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে তাপজনিত মৃত্যুর ঝুঁকি কতটা বেড়েছে, তা মূল্যায়নের জন্য ব্যবহৃত গবেষণাভিত্তিক অনুমান।
দীর্ঘ সময়ের পরিসংখ্যানেও একই উদ্বেগ দেখা যায়। ২০১৬ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে প্রতি বছর গড়ে আনুমানিক ৫ লক্ষ ৪০ হাজার ৮০০টি মৃত্যু তাপের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল। এর মধ্যে বছরে প্রায় ৩ লক্ষ ৬৯ হাজার ৯০০টি মৃত্যুর সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব যুক্ত করা হয়েছে, যা মোট তাপ-সম্পর্কিত মৃত্যুর আনুমানিক ৬৮ শতাংশ। তুলনায়, ২০০৬ থেকে ২০১৫ সালের দশকে এই অনুপাত ছিল প্রায় ৫৫ শতাংশ। গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, তাপজনিত মৃত্যুর বোঝার মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের অবদান বেড়েছে। তবে এই ধরনের পরিসংখ্যান ব্যাখ্যা করার সময় গবেষণার পদ্ধতি ও অনুমানের সীমাবদ্ধতাও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।
স্বাস্থ্যগত ক্ষতির পাশাপাশি তাপপ্রবাহের অর্থনৈতিক প্রভাবও উল্লেখযোগ্য। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে অতিরিক্ত গরমের কারণে মানুষের কাজ করার ক্ষমতা ব্যাহত হওয়ায় বিশ্ব অর্থনীতিতে আনুমানিক ১.০৭ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের উৎপাদনশীলতা-সংক্রান্ত ক্ষতি হয়েছিল। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও আফ্রিকার দেশগুলিতে মোট দেশজ উৎপাদনের তুলনায় এই ক্ষতির চাপ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ছিল। কৃষি ও নির্মাণশিল্প সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষেত্রগুলির মধ্যে রয়েছে, কারণ এই শিল্পগুলিতে বিপুলসংখ্যক মানুষকে বাইরে শারীরিক পরিশ্রম করতে হয়। কাজের সময় কমে গেলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি দৈনিক মজুরির উপর নির্ভরশীল শ্রমিকদের আয়ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
জলবায়ু পরিবর্তনের স্বাস্থ্যঝুঁকি শুধু অতিরিক্ত গরমে সীমাবদ্ধ নয়। খরা কৃষি উৎপাদনকে ব্যাহত করতে পারে, খাদ্যসংকট ও অপুষ্টির ঝুঁকি বাড়াতে পারে এবং নিরাপদ জল সরবরাহের উপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। অন্যদিকে, বন্যার পর সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে। শ্বাসযন্ত্র ও পরিপাকতন্ত্রের সমস্যাও জনস্বাস্থ্যের উপর বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে। একই সময়ে একাধিক বিপর্যয় ঘটলে হাসপাতাল, চিকিৎসাকর্মী, ওষুধ এবং জরুরি পরিষেবার উপর চাপ আরও বাড়ে। ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব খাদ্য, জল, জীবিকা এবং স্বাস্থ্যপরিষেবার মতো পরস্পরনির্ভর ক্ষেত্রগুলিকেও প্রভাবিত করে।
প্রতিবেদনে জীবাশ্ম জ্বালানির ভবিষ্যৎ উৎপাদন পরিকল্পনা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। গবেষকদের মূল্যায়ন অনুযায়ী, ২০৪০ সালের মধ্যে বিশ্বের ১০০টি বৃহত্তম তেল ও গ্যাস কোম্পানি যে পরিমাণ জীবাশ্ম জ্বালানি উৎপাদনের পরিকল্পনা করছে, তা বৈশ্বিক উষ্ণতা ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ উৎপাদনমাত্রার তুলনায় ১৫০ শতাংশ বেশি। এই হিসাব জীবাশ্ম জ্বালানির উৎপাদন পরিকল্পনা এবং জলবায়ু লক্ষ্যের মধ্যে ব্যবধান তুলে ধরে। তবে এটি ভবিষ্যৎ উৎপাদনের পরিকল্পনাভিত্তিক মূল্যায়ন; বাস্তবে উৎপাদনের পরিমাণ নীতি, বিনিয়োগ এবং আন্তর্জাতিক পদক্ষেপের উপর নির্ভর করবে।
এই সংকট মোকাবিলায় বিশেষজ্ঞেরা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং রাষ্ট্রসংঘের কাছে জলবায়ু পরিবর্তনকে বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তাঁরা জলবায়ু নীতির কেন্দ্রে মানুষের স্বাস্থ্যকে রাখার এবং জলবায়ু ও স্বাস্থ্য সংক্রান্ত উদ্যোগে অনুদানভিত্তিক অর্থায়ন বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছেন। তাঁদের মতে, গ্রিনহাউস গ্যাসের নির্গমন দ্রুত, ন্যায়সংগত এবং সমতাভিত্তিক উপায়ে কমানো জরুরি। কারণ জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি সব মানুষের উপর সমানভাবে পড়ে না। যাঁদের বাইরে কাজ করতে হয় এবং যেসব অঞ্চলে স্বাস্থ্যপরিষেবা ও দুর্যোগ মোকাবিলার পরিকাঠামো সীমিত, তাঁরা তুলনামূলকভাবে বেশি ঝুঁকির মুখে পড়েন।
তবে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় কোনও অগ্রগতিই হয়নি—প্রতিবেদনটি এমন দাবি করে না। গবেষকেরা পরিচ্ছন্ন শক্তির প্রসার, স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রস্তুতি এবং স্বাস্থ্যরক্ষাকারী বিধিনিয়মের উন্নতির মতো ইতিবাচক পরিবর্তনের কথাও উল্লেখ করেছেন। তাঁদের মতে, এসব উদ্যোগ ইতিমধ্যেই বিভিন্ন সম্প্রদায়ের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সুফল দিচ্ছে। মূল সমস্যা হল, অগ্রগতির গতি ও পরিসর এখনও বাড়তে থাকা ঝুঁকির তুলনায় যথেষ্ট নয়। তাই নির্গমন কমানোর উদ্যোগের পাশাপাশি স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে চরম তাপপ্রবাহ ও অন্যান্য জলবায়ুজনিত বিপর্যয়ের জন্য প্রস্তুত করাও জরুরি।
জলবায়ু পরিবর্তনকে বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হলে তার বাস্তব ফল কী হবে, তা এখনও নিশ্চিত নয়। শুধু ঘোষণা করলেই নির্গমন কমবে না, হাসপাতালের সক্ষমতা বাড়বে না কিংবা চরম আবহাওয়ার ক্ষতি বন্ধ হবে না। এর কার্যকারিতা নির্ভর করবে ঘোষণার পর সরকার ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলি কী পদক্ষেপ নেয়, তার উপর। বিশেষজ্ঞদের আহ্বানকে তাই চূড়ান্ত সমাধান হিসেবে নয়, বরং জলবায়ু নীতি ও স্বাস্থ্যনীতিকে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করার প্রস্তাব হিসেবে দেখা প্রয়োজন।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব শেষ পর্যন্ত মানুষের দৈনন্দিন জীবনেই ধরা পড়ে—কতক্ষণ একজন শ্রমিক নিরাপদে কাজ করতে পারবেন, কোনও অঞ্চলে পর্যাপ্ত খাদ্য ও নিরাপদ জল পাওয়া যাবে কি না, কিংবা চরম আবহাওয়ার পর স্বাস্থ্যপরিষেবা কতটা কার্যকর থাকবে। এই বাস্তবতাকে নীতিনির্ধারণের কেন্দ্রে রাখা গেলে নির্গমন কমানোর পাশাপাশি মানুষের জীবন ও জীবিকা রক্ষার বিষয়টিও গুরুত্ব পাবে। এখন বড় প্রশ্ন, আন্তর্জাতিক স্তরে এই আহ্বান কতটা কার্যকর পদক্ষেপে রূপ নেয় এবং সেই পদক্ষেপের সুফল সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা মানুষের কাছে কত দ্রুত পৌঁছয়।
তথ্যসূত্র: The Lancet Countdown on Health and Climate Change, The Lancet, ২০২৬; ScienceAlert, ২৮ অক্টোবর ২০২৬।