মস্তিষ্কের ডান দিক কেন শরীরের বাঁ দিক নিয়ন্ত্রণ করে? বিবর্তনের নতুন ব্যাখ্যা
আমরা যখন বাঁ হাত দিয়ে কোনও জিনিস তুলি, তখন সেই হাতের নড়াচড়া নিয়ন্ত্রণে মস্তিষ্কের ডান দিক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। একইভাবে, ডান হাতের সূক্ষ্ম নড়াচড়ার ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের বাঁ দিকের ভূমিকা প্রধান। শুধু পেশি নিয়ন্ত্রণ নয়, শরীরের বিভিন্ন অংশ থেকে আসা স্পর্শ, ব্যথা ও অন্যান্য সংবেদনও মস্তিষ্কের বিপরীত দিকে পৌঁছয়। কিন্তু স্নায়ুতন্ত্রের এই অদ্ভুত বিন্যাস তৈরি হল কীভাবে? নতুন এক গবেষণায় বিজ্ঞানীরা এর উত্তর খুঁজতে ফিরে গিয়েছেন প্রাচীন মেরুদণ্ডী প্রাণীদের বিবর্তনের ইতিহাসে।
২০২৬ সালের ২৭ অক্টোবর Frontiers in Neuroanatomy জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে স্নায়ুবিজ্ঞানী মার্টিন ডব্লিউ. ওয়েসেনডর্ফ এবং ড্যানিয়েল ডেলি ওয়াং প্রস্তাব করেছেন, মস্তিষ্ক ও শরীরের এই বিপরীতমুখী সংযোগের বিবর্তনে প্রাচীন দৃষ্টিসংক্রান্ত স্নায়ুপথের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। তাঁদের মতে, পরবর্তী সময়ে গড়ে ওঠা সংবেদন ও চলাচল নিয়ন্ত্রণের স্নায়ুপথগুলি সম্ভবত আগে থেকেই প্রতিষ্ঠিত এই বিন্যাস অনুসরণ করেছে। তবে এটি একটি বিবর্তনমূলক অনুমান, পরীক্ষার মাধ্যমে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত ব্যাখ্যা নয়।
চোখের দৃষ্টি থেকেই কি শুরু হয়েছিল এই বিবর্তন?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গবেষকেরা প্রথমে নজর দিয়েছেন চোখ থেকে মস্তিষ্কে তথ্য পৌঁছনোর প্রক্রিয়ায়। চোখের লেন্স বাইরের দৃশ্যকে রেটিনায় উল্টে প্রতিফলিত করে। এরপর রেটিনা থেকে আসা স্নায়ুসংকেত অপটিক নার্ভ বা দৃষ্টিস্নায়ুর মাধ্যমে মস্তিষ্কের দিকে যায়। অপটিক কিয়াজম (optic chiasm) নামের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থলে দৃষ্টিক্ষেত্রের তথ্য বহনকারী স্নায়ুতন্তুর একটি অংশ বিপরীত দিকে অতিক্রম করে।

এর ফলে আমাদের ডান দিকের দৃষ্টিক্ষেত্রের তথ্য প্রধানত মস্তিষ্কের বাঁ দিকের ভিজ়ুয়াল কর্টেক্সে এবং বাঁ দিকের দৃষ্টিক্ষেত্রের তথ্য ডান দিকের ভিজ়ুয়াল কর্টেক্সে প্রক্রিয়াকৃত হয়। এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—প্রতিটি চোখের সমস্ত স্নায়ুতন্তু বিপরীত দিকে চলে যায় না। দুই চোখের দৃষ্টিসংকেতের একটি অংশ বিপরীত দিকে অতিক্রম করে, অন্য অংশ একই দিকে থাকে। এই বিন্যাস দুই চোখের তথ্যকে একত্রিত করে দৃশ্যের অবস্থান ও গভীরতা বুঝতে সাহায্য করে।
গবেষণাটিতে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে অপটিক টেকটাম (optic tectum)। এটি মস্তিষ্কের মধ্যমস্তিষ্ক অঞ্চলের একটি বিবর্তনগতভাবে প্রাচীন কাঠামো, যা বহু মেরুদণ্ডী প্রাণীর দৃষ্টিসংক্রান্ত তথ্য গ্রহণ করে এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়া তৈরিতে সাহায্য করে। স্তন্যপায়ী প্রাণীদের ক্ষেত্রে এর সমতুল্য কাঠামো সুপিরিয়র কোলিকুলাস (superior colliculus) নামে পরিচিত।
গবেষকদের বক্তব্য, মেরুদণ্ডী প্রাণীদের দৃষ্টিব্যবস্থায় বিপরীতমুখী সংযোগের বিস্তৃত উপস্থিতি একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র। তাঁদের অনুমান, বিবর্তনের প্রাথমিক পর্যায়েই যখন দৃষ্টিসংক্রান্ত স্নায়ুপথের এই বিন্যাস প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তখন পরবর্তী সময়ে গড়ে ওঠা অন্যান্য স্নায়ুপথের সংগঠনও তার দ্বারা প্রভাবিত হয়ে থাকতে পারে।
শরীরের স্পর্শ ও ব্যথার সংকেত কেন বিপরীত দিকে যায়?
আমাদের শরীরের সঙ্গে মস্তিষ্কের যোগাযোগ শুধু চোখের মাধ্যমে হয় না। ত্বকে হালকা স্পর্শ, কম্পন, অঙ্গপ্রত্যঙ্গের অবস্থান কিংবা ব্যথার মতো অনুভূতির তথ্যও স্নায়ুপথ দিয়ে মস্তিষ্কে পৌঁছয়। এই তথ্য বহনকারী একাধিক স্নায়ুপথের ক্ষেত্রে সংকেত কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের মধ্যরেখা অতিক্রম করে বিপরীত দিকে চলে যায়।
এর একটি উদাহরণ ডরসাল কলাম-মিডিয়াল লেমনিস্কাস পথ (dorsal column–medial lemniscus pathway)। এটি সূক্ষ্ম স্পর্শ, কম্পন এবং শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গের অবস্থান বুঝতে সাহায্য করে। এই পথে সংবেদনবাহী সংকেত মেরুরজ্জু দিয়ে উপরের দিকে উঠে ব্রেনস্টেমে পৌঁছয়। সেখানে পরবর্তী স্নায়ুকোষে সংকেত স্থানান্তরের পর তা বিপরীত দিকে অতিক্রম করে।
অন্যদিকে, স্পাইনোথ্যালামিক ট্র্যাক্ট (spinothalamic tract) ব্যথা, চুলকানি এবং কিছু ধরনের স্পর্শের সংকেত বহন করে। এই পথের একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য হল, সংকেত সাধারণত মেরুরজ্জুর মধ্যেই বিপরীত দিকে অতিক্রম করে। এরপর তা থ্যালামাসে পৌঁছয়। থ্যালামাস মস্তিষ্কের এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যা বিভিন্ন সংবেদনগত তথ্য প্রক্রিয়াকরণ ও সংশ্লিষ্ট মস্তিষ্কীয় অঞ্চলে পাঠাতে সাহায্য করে।
গবেষকদের আলোচনায় দেখা যায়, এই ধরনের বিপরীতমুখী সংবেদনপথ শুধু মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিভিন্ন স্তন্যপায়ী প্রাণী, পাখি, সরীসৃপ ও উভচর প্রাণীর স্নায়ুতন্ত্রেও এমন বিন্যাস দেখা যায়। এই বিস্তৃত উপস্থিতি ইঙ্গিত দেয়, চার অঙ্গবিশিষ্ট মেরুদণ্ডী প্রাণীদের বিবর্তনের ইতিহাসে এই সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে সংরক্ষিত রয়েছে।
নড়াচড়া নিয়ন্ত্রণেও একই বিন্যাস
মস্তিষ্ক থেকে পেশিতে নির্দেশ পাঠানোর ক্ষেত্রেও বিপরীতমুখী স্নায়ুপথের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। গবেষণাপত্রে আলোচিত হয়েছে এমন তিনটি পথ—টেক্টোস্পাইনাল, রুব্রোস্পাইনাল এবং কর্টিকোস্পাইনাল ট্র্যাক্ট।
টেক্টোস্পাইনাল পথ দৃষ্টি, শব্দ কিংবা স্পর্শের মতো উদ্দীপনায় দ্রুত মাথা ও শরীর ঘোরানোর প্রতিক্রিয়ায় সাহায্য করে। উদাহরণ হিসেবে, রাস্তা পার হওয়ার সময় চোখের কোণে দ্রুত এগিয়ে আসা কোনও গাড়ি দেখতে পেলে আমরা তার দিকে মাথা ঘুরিয়ে তাকাই। এমন প্রতিক্রিয়া তৈরিতে দৃষ্টিসংক্রান্ত স্নায়ুপথের ভূমিকা রয়েছে।
রুব্রোস্পাইনাল পথ মস্তিষ্কের মধ্যমস্তিষ্কে অবস্থিত রেড নিউক্লিয়াস থেকে শুরু হয়ে মেরুরজ্জুর দিকে সংকেত পাঠায়। বিভিন্ন প্রাণীর অঙ্গপ্রত্যঙ্গের নড়াচড়া নিয়ন্ত্রণে এই পথের ভূমিকা রয়েছে, যদিও বিভিন্ন প্রজাতিতে এর গুরুত্ব এক নয়।
মানুষের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ কর্টিকোস্পাইনাল ট্র্যাক্ট (corticospinal tract)। এই পথ মস্তিষ্কের সেরিব্রাল কর্টেক্স থেকে মেরুরজ্জু পর্যন্ত বিস্তৃত এবং স্বেচ্ছাধীন নড়াচড়া নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। বিশেষত মানুষের আঙুলের সূক্ষ্ম নড়াচড়া, লেখা, ছোট কোনও বস্তু ধরে তোলা কিংবা কোনও যন্ত্র নিখুঁতভাবে ব্যবহার করার মতো কাজে এই স্নায়ুপথ গুরুত্বপূর্ণ।
তবে সব স্তন্যপায়ী প্রাণীর কর্টিকোস্পাইনাল পথ একইভাবে কাজ করে না। মানুষের মতো প্রাইমেটদের ক্ষেত্রে এই পথের উল্লেখযোগ্য অংশ মেরুরজ্জুর সেই স্নায়ুকোষগুলির সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে, যেগুলি পেশির নড়াচড়া নিয়ন্ত্রণ করে। অন্য অনেক স্তন্যপায়ী প্রাণীতে এর ভূমিকা তুলনামূলকভাবে বেশি সংবেদন নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে যুক্ত। গবেষকদের মতে, এই বিবর্তনগত পরিবর্তন থেকে বোঝা যায়, পুরনো স্নায়ুপথের কাঠামোকে নতুন কাজের জন্য ব্যবহার করেই বিবর্তন সূক্ষ্ম মোটর নিয়ন্ত্রণের মতো ক্ষমতা গড়ে তুলেছে।
বিবর্তন কি নতুন করে তৈরি করে না, পুরনো কাঠামোকেই কাজে লাগায়?
এই গবেষণার মূল ধারণাটি এখানেই। বিবর্তন সব সময় শূন্য থেকে নতুন জৈবিক ব্যবস্থা তৈরি করে না। অনেক ক্ষেত্রেই আগে থেকে থাকা কাঠামো, জিনগত ব্যবস্থা ও স্নায়ুপথের পরিবর্তন ঘটিয়ে নতুন কার্যকারিতা তৈরি হয়। জীববিজ্ঞানে এই ধরনের প্রক্রিয়াকে প্রায়ই পুরনো কাঠামোর নতুন কাজে ব্যবহারের উদাহরণ হিসেবে দেখা হয়।
ওয়েসেনডর্ফ ও ওয়াংয়ের প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রাচীন মেরুদণ্ডী প্রাণীদের দৃষ্টিসংক্রান্ত স্নায়ুপথে যদি বিপরীতমুখী সংগঠন আগে থেকেই প্রতিষ্ঠিত হয়ে থাকে, তবে পরবর্তী সময়ে বিকশিত সংবেদন ও চলাচল নিয়ন্ত্রণের স্নায়ুপথগুলিও সেই সংগঠনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে গড়ে উঠতে পারে। পরে যখন স্তন্যপায়ী প্রাণীদের সেরিব্রাল কর্টেক্স আরও জটিল হয়ে ওঠে, তখন তার স্নায়ুপথও বিদ্যমান ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুবিধা পায়।
এই ব্যাখ্যা অনুযায়ী, মস্তিষ্ক ও শরীরের বিপরীতমুখী সংযোগ সরাসরি কোনও বিশেষ সুবিধা অর্জনের জন্যই বিবর্তিত হয়েছিল, এমনটা ধরে নেওয়া জরুরি নয়। বরং বিবর্তনের প্রাথমিক পর্যায়ে প্রতিষ্ঠিত একটি বিন্যাস পরবর্তী স্নায়ুতন্ত্রের গঠনকে প্রভাবিত করে থাকতে পারে।
গবেষকেরা আরও অনুমান করেছেন, প্রায় ৫৩.৮ কোটি থেকে ৪৮.৬ কোটি বছর আগের ক্যামব্রিয়ান যুগের চোয়ালবিহীন প্রাচীন মাছের মতো মেরুদণ্ডী প্রাণীদের মধ্যেও অপটিক কিয়াজম এবং অপটিক টেকটামের এমন সংগঠন ছিল। তবে এই প্রাচীন প্রাণীদের নরম স্নায়ুতন্ত্র জীবাশ্মে সরাসরি সংরক্ষিত না থাকায় অনুমানটি যাচাই করা কঠিন। মাথার খুলির জীবাশ্মে প্রাসঙ্গিক শারীরস্থানগত চিহ্ন খুঁজে ভবিষ্যতে এই ধারণার কিছু দিক পরীক্ষা করা সম্ভব হতে পারে।
এখনও কি রহস্যের সম্পূর্ণ সমাধান হয়নি?
না। গবেষণাটি কোনও নতুন পরীক্ষামূলক ফলাফলের মাধ্যমে বিপরীতমুখী স্নায়ুপথের বিবর্তন চূড়ান্তভাবে প্রমাণ করেনি। এটি বিভিন্ন জীবিত মেরুদণ্ডী প্রাণীর স্নায়ুপথ সম্পর্কে বিদ্যমান তথ্য পর্যালোচনা করে তৈরি একটি ‘হাইপোথিসিস অ্যান্ড থিওরি’ ধরনের গবেষণাপত্র। অর্থাৎ, এর মূল অবদান হল একটি নতুন বিবর্তনমূলক ব্যাখ্যা প্রস্তাব করা।
এই অনুমানের শক্তি হল, এটি দৃষ্টি, সংবেদন ও চলাচল নিয়ন্ত্রণের মতো একাধিক স্নায়ুপথকে একই বিবর্তনমূলক কাঠামোর মধ্যে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করে। তবে প্রাচীন প্রাণীদের স্নায়ুতন্ত্রের প্রকৃত সংগঠন সম্পর্কে আরও প্রমাণ প্রয়োজন। বিভিন্ন প্রাণীর স্নায়ুপথের তুলনামূলক বিশ্লেষণ এবং জীবাশ্ম থেকে পাওয়া তথ্য এই ধারণার গ্রহণযোগ্যতা যাচাই করতে সাহায্য করবে।
মস্তিষ্কের ডান দিক শরীরের বাঁ দিককে নিয়ন্ত্রণ করে কেন—তার উত্তর তাই এখনও পুরোপুরি জানা যায়নি। তবে এই গবেষণা একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনার দিকে ইঙ্গিত করে: আজকের জটিল স্নায়ুতন্ত্রের কিছু বৈশিষ্ট্যের শিকড় এমন এক বিবর্তনীয় ইতিহাসে লুকিয়ে রয়েছে, যার সূচনা হয়েছিল মানুষের আবির্ভাবের বহু কোটি বছর আগে।
তথ্যসূত্র :
১. Wessendorf, M. W. & Wang, D. D. (2026). Why is the right side of the brain responsible for the left side of the body? The evolutionary history of a puzzling trait. Frontiers in Neuroanatomy, 20. DOI: 10.3389/fnana.2026.1937941.
মূল গবেষণাপত্র: https://doi.org/10.3389/fnana.2026.1937941
গবেষণার সংবাদভিত্তিক ব্যাখ্যা: https://www.frontiersin.org/news/2026/10/27/right-side-brain-control-left-side-body-evolutionary-history