শুক্রাণুর ভিতরে RNA পৌঁছে দিচ্ছে অ্যামাইলয়েড ফাইব্রিল! ভ্রূণের বিকাশে নতুন আণবিক পরিবহনব্যবস্থার সন্ধান
শুক্রাণুর কাজ শুধু ডিম্বাণুর সঙ্গে মিলিত হয়ে নতুন জীবনের সূচনা করা নয়। পুরুষ প্রজননতন্ত্র থেকে আসা কিছু ক্ষুদ্র RNA অণুও ভ্রূণের প্রাথমিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু এই RNA অণুগুলি কীভাবে বীর্যরস থেকে শুক্রাণুর ভিতরে প্রবেশ করে এবং নিষেকের পর ভ্রূণ পর্যন্ত পৌঁছয়, তা এত দিন পুরোপুরি স্পষ্ট ছিল না। ২০২৬ সালের ২৬ অক্টোবর Molecular Cell জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় বিজ্ঞানীরা এই প্রক্রিয়ার একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা তুলে ধরেছেন। তাঁদের অনুসন্ধান অনুযায়ী, বীর্যরসে থাকা বিশেষ ধরনের অ্যামাইলয়েড ফাইব্রিল RNA-কে ধরে শুক্রাণুর ভিতরে পৌঁছে দিতে এবং নিষেকের পর ভ্রূণে তার সরবরাহে সাহায্য করতে পারে।
অ্যামাইলয়েডের কথা উঠলেই সাধারণত আলঝাইমারসের মতো স্নায়ুরোগের সঙ্গে সম্পর্কিত প্রোটিনের অস্বাভাবিক জমাট বাঁধার কথা মনে পড়ে। কিন্তু সব অ্যামাইলয়েডই ক্ষতিকর নয়। কিছু প্রোটিন নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সুসংগঠিত তন্তুর মতো কাঠামো তৈরি করে, যা জীবদেহে কার্যকর ভূমিকা পালন করে। এগুলিকে বলা হয় কার্যকরী অ্যামাইলয়েড (functional amyloid)। নতুন গবেষণায় দেখা গিয়েছে, বীর্যরসের একটি প্রোটিন থেকে তৈরি ক্ষুদ্র অংশ RNA-র সঙ্গে যুক্ত হয়ে এমন অ্যামাইলয়েড কাঠামো গঠন করে, যা আণবিক বাহকের মতো কাজ করতে পারে। অর্থাৎ, এই কাঠামোর ভূমিকা শুধু প্রোটিনের সমাবেশে সীমাবদ্ধ নয়; জিনগত তথ্য বহনকারী RNA-র পরিবহনেও এর সম্ভাব্য অবদান রয়েছে।

গবেষণায় শুক্রাণুর মাধ্যমে RNA পরিবহন এবং প্রাথমিক ভ্রূণে তার পৌঁছনোর সম্ভাব্য প্রক্রিয়া অনুসন্ধান করা হয়েছে।
গবেষণাটির কেন্দ্রে রয়েছে PAP নামের প্রোটিনের ২৪৮ থেকে ২৮৬ নম্বর অ্যামিনো অ্যাসিড দিয়ে তৈরি একটি অংশ, যা PAP(248–286) নামে পরিচিত। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, এই অংশ RNA-র সঙ্গে মিশে প্রথমে ক্ষুদ্র তরলবিন্দুর মতো কাঠামো তৈরি করে। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় liquid–liquid phase separation বা তরল-তরল দশা-বিচ্ছেদ। সহজভাবে বললে, দ্রবণে ছড়িয়ে থাকা অণুগুলি নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে এক জায়গায় ঘনীভূত হয়ে আলাদা একটি তরলসম পরিবেশ তৈরি করে। পরে এই কাঠামো আরও সুসংগঠিত হয়ে অ্যামাইলয়েড ফাইব্রিলে পরিণত হয়। RNA-র উপস্থিতি এই পরিবর্তনকে ত্বরান্বিত করে। গবেষণায় RNA ছাড়া ফাইব্রিল তৈরির অর্ধেক পর্যায়ে পৌঁছতে প্রায় ২৬ ঘণ্টা লাগলেও RNA-র উপস্থিতিতে সময় কমে প্রায় ৭.৯৬ ঘণ্টা হয়। অর্থাৎ, RNA এখানে শুধু পরিবহনযোগ্য উপাদান নয়; ফাইব্রিল গঠনের প্রক্রিয়াতেও সক্রিয় ভূমিকা নেয়।
এরপর গবেষকেরা মানুষের বীর্যরস থেকে পাওয়া অ্যামাইলয়েডসমৃদ্ধ অংশ বিশ্লেষণ করেন। সেখানে বিভিন্ন ক্ষুদ্র RNA শনাক্ত হয়, যার মধ্যে ট্রান্সফার RNA বা tRNA থেকে তৈরি খণ্ড উল্লেখযোগ্য। সাধারণত tRNA কোষে প্রোটিন তৈরির সময় অ্যামিনো অ্যাসিডকে নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছে দেয়। তবে tRNA ভেঙে তৈরি হওয়া ক্ষুদ্র RNA-খণ্ডও কোষের বিভিন্ন নিয়ন্ত্রণমূলক কাজে অংশ নিতে পারে। গবেষণায় tRNA-Pro-CGG, tRNA-Val-CAC এবং tRNA-Arg-CCG-জাতীয় RNA-খণ্ডের উপস্থিতি পাওয়া যায়। এই পর্যবেক্ষণ থেকে বোঝা যায়, বীর্যরসের অ্যামাইলয়েডসমৃদ্ধ অংশে নির্দিষ্ট RNA জমা থাকে। তবে তাদের উপস্থিতিই প্রমাণ করে না যে প্রতিটি RNA ভ্রূণের বিকাশে একই ধরনের ভূমিকা পালন করে।
RNA-যুক্ত অ্যামাইলয়েড ফাইব্রিল সত্যিই শুক্রাণুর ভিতরে প্রবেশ করে কি না, তা যাচাই করতে গবেষকেরা একাধিক পদ্ধতি ব্যবহার করেন। ক্রায়ো-ইলেকট্রন টোমোগ্রাফি (cryo-electron tomography) দিয়ে অত্যন্ত নিম্ন তাপমাত্রায় কোষের সূক্ষ্ম ত্রিমাত্রিক গঠন পর্যবেক্ষণ করা হয়। এই পদ্ধতিতে গরুর শুক্রাণুর ভিতরে অ্যামাইলয়েড ফাইব্রিলের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কাঠামো দেখা যায়। পাশাপাশি ফ্লুরোসেন্ট লেবেলযুক্ত ফাইব্রিল ব্যবহার করে কোষের সঙ্গে তাদের মিথস্ক্রিয়া পরীক্ষা করা হয়। মানুষের শুক্রাণুতে ফ্লুরোসেন্স-ভিত্তিক বিশ্লেষণে প্রায় ২.৪৪ শতাংশ কোষে ফাইব্রিল গ্রহণের সংকেত পাওয়া যায়। কোষের পৃষ্ঠের কিছু প্রোটিন কেটে দিতে পারে এমন ট্রিপসিন দিয়ে নমুনা প্রক্রিয়াকরণের পর হারটি কমে প্রায় ০.৩০ শতাংশে নেমে আসে। ফলাফলটি ইঙ্গিত দেয়, শুক্রাণুর পৃষ্ঠের প্রোটিন এই প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখতে পারে। তবে নির্দিষ্ট কোন প্রোটিন জড়িত এবং স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে কত সংখ্যক শুক্রাণু ফাইব্রিল গ্রহণ করে, তা এখনও নিশ্চিত নয়।
গবেষণার পরবর্তী ধাপে বিজ্ঞানীরা পরীক্ষা করেন, এই কাঠামো নিষেকের পর ভ্রূণ পর্যন্ত পৌঁছতে পারে কি না। এ জন্য তাঁরা ইঁদুরের শুক্রাণু ব্যবহার করে পরীক্ষাগারে নিষেক (in vitro fertilization) সম্পন্ন করেন। নিষেকের আগে শুক্রাণুকে মানুষের PAP-জাতীয় অ্যামাইলয়েড ফাইব্রিলের সংস্পর্শে আনা হয়। পরে শুক্রাণু ও দুই-কোষীয় ভ্রূণ বিশ্লেষণ করে মানুষের PAP প্রোটিনের কিছু অংশ শনাক্ত করা হয়। ফ্লুরোসেন্টভাবে চিহ্নিত ফাইব্রিল ব্যবহার করেও পরীক্ষা চালানো হয়; এমন পরীক্ষায় প্রায় ২০ শতাংশ ভ্রূণে ফাইব্রিলের সংকেত পাওয়া যায়। এই ফলাফল পরীক্ষাগারের নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে ফাইব্রিল বা তার উপাদান ভ্রূণ পর্যন্ত পৌঁছনোর সম্ভাবনাকে সমর্থন করে। তবে এটি মানুষের স্বাভাবিক নিষেকপ্রক্রিয়ার সরাসরি প্রমাণ নয়, কারণ পরীক্ষাটি ইঁদুরের মডেলে করা হয়েছিল।
RNA ভ্রূণে পৌঁছলেই তার কাজ শেষ হয় না; সেটিকে বাহক কাঠামো থেকে মুক্ত হয়ে কোষে ব্যবহারযোগ্য অবস্থায় আসতে হয়। এই পর্যায়ে গবেষকেরা ক্লাস্টেরিন (clusterin) নামের একটি প্রোটিনের ভূমিকা পরীক্ষা করেন। ক্লাস্টেরিন প্রোটিনের সমাবেশ ও স্থিতিশীলতা নিয়ন্ত্রণে অংশ নেয়। পরীক্ষায় দেখা যায়, এটি অ্যামাইলয়েড ফাইব্রিল থেকে RNA মুক্ত হতে সাহায্য করে। এরপর বিজ্ঞানীরা EGFP নামের একটি সবুজ ফ্লুরোসেন্ট প্রোটিন তৈরির নির্দেশ বহনকারী mRNA ব্যবহার করেন। ফাইব্রিলের সঙ্গে যুক্ত EGFP mRNA ব্যবহার করলে, ফাইব্রিল ছাড়া mRNA-র তুলনায় অন্তত দশ গুণ বেশি EGFP প্রোটিন তৈরি হয়। এই ফলাফল RNA-র পরিবহন এবং পরবর্তী ব্যবহারের সম্ভাবনাকে সমর্থন করে। তবে ফাইব্রিল ছাড়া নমুনাতেও কিছু প্রোটিন তৈরি হয়েছিল। তাই এই পার্থক্যের সম্পূর্ণ কারণ যে শুধু ফাইব্রিলের মাধ্যমে RNA পরিবহন, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।
এই গবেষণার গুরুত্ব শুক্রাণুর জীববিজ্ঞান বোঝার বাইরেও বিস্তৃত। কোষের ভিতরে RNA পৌঁছে দেওয়া আধুনিক জীববিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। RNA-ভিত্তিক চিকিৎসা, জিনের কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণ এবং কোষে নির্দিষ্ট জৈবিক পরিবর্তন ঘটানোর গবেষণায় কার্যকর বাহক প্রয়োজন। অ্যামাইলয়েড ফাইব্রিল যদি RNA-কে ধরে রেখে নির্দিষ্ট জৈবিক পরিবেশে পৌঁছে দিতে পারে, তবে ভবিষ্যতে এই বৈশিষ্ট্য কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এই গবেষণা থেকে এখনই মানুষের ভ্রূণে জিন পরিবর্তনের নিরাপদ পদ্ধতি কিংবা নতুন RNA-চিকিৎসা আবিষ্কৃত হয়েছে—এমন দাবি করা যাবে না। চিকিৎসায় প্রয়োগের আগে বাহকটির নিরাপত্তা, নির্দিষ্টতা, কার্যকারিতা এবং সম্ভাব্য অনাকাঙ্ক্ষিত প্রভাব নিয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
গবেষণাটির কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। শুক্রাণুর ভিতরে ফাইব্রিলের অবস্থান বোঝার জন্য করা সূক্ষ্ম ত্রিমাত্রিক পর্যবেক্ষণে ৭৪টি শুক্রাণু-কোষের ল্যামেলা পরীক্ষা করা হলেও মাত্র পাঁচটি নমুনার টোমোগ্রাম ব্যাখ্যার উপযোগী ছিল। তার মধ্যে মাত্র দুটিতে কোষের ভিতরে ফাইব্রিলের কাঠামো স্পষ্টভাবে শনাক্ত করা যায়। মানুষের শুক্রাণুতে ফাইব্রিল গ্রহণের শনাক্তকৃত হারও কম ছিল। ফলে স্বাভাবিক প্রজননপ্রক্রিয়ায় এই ব্যবস্থার প্রকৃত গুরুত্ব, RNA পরিবহনের পরিমাণ এবং ভ্রূণের বিকাশে তার নির্দিষ্ট প্রভাব এখনও আরও পরীক্ষার দাবি রাখে। মানুষের ক্ষেত্রে এই প্রক্রিয়া কতটা কার্যকর, কিংবা সন্তানের দীর্ঘমেয়াদি বৈশিষ্ট্যে এর কোনও প্রভাব রয়েছে কি না, গবেষণাটি তার উত্তর দেয়নি।
সব মিলিয়ে, গবেষণাটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনার দিকে ইঙ্গিত করছে: বীর্যরসের অ্যামাইলয়েড ফাইব্রিল শুক্রাণুর সঙ্গে RNA-র সংযোগ এবং নিষেকের পর তার ভ্রূণ পর্যন্ত পৌঁছনোর প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে পারে। ক্লাস্টেরিনের মতো প্রোটিন RNA মুক্ত করতেও সাহায্য করতে পারে। তবে এই ব্যবস্থার প্রকৃত জৈবিক গুরুত্ব ও মানুষের প্রজননে এর ভূমিকা বুঝতে আরও গবেষণা প্রয়োজন। আপাতত সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, যে অ্যামাইলয়েডকে সাধারণত রোগের সঙ্গে যুক্ত করে দেখা হয়, তার নির্দিষ্ট রূপ জীবদেহে RNA পরিবহনের মতো কার্যকর কাজেও অংশ নিতে পারে। এই আবিষ্কার শুক্রাণু ও ভ্রূণের প্রাথমিক বিকাশ সম্পর্কে আমাদের ধারণা বাড়ানোর পাশাপাশি RNA পরিবহনের নতুন জৈবিক পদ্ধতি নিয়ে গবেষণার পথও খুলে দিতে পারে।
তথ্যসূত্র:
১. Mallen, W. S. ও সহলেখকরা। “Amyloid-mediated RNA uptake by sperm for embryonic delivery.” Molecular Cell, অনলাইনে প্রকাশিত ২৬ অক্টোবর ২০২৬। মূল গবেষণাপত্র: https://pmc.ncbi.nlm.nih.gov/articles/PMC12709466/
সম্পাদকীয় নোট: গবেষণার ফলাফল পরীক্ষাগার ও ইঁদুরের মডেলভিত্তিক। মানুষের স্বাভাবিক প্রজনন বা চিকিৎসায় এই প্রক্রিয়ার কার্যকারিতা এখনও প্রতিষ্ঠিত নয়।