সূর্যের শক্তি তৈরির পথে বড় চমক! ফিউশন রিঅ্যাক্টরে কম শক্তি খরচের নতুন উপায় খুঁজলেন বিজ্ঞানীরা
সূর্যের বিপুল শক্তির উৎস নিউক্লিয়ার ফিউশন বা পারমাণবিক সংযোজন। এই প্রক্রিয়ায় হালকা পরমাণুর নিউক্লিয়াস পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ভারী নিউক্লিয়াস তৈরি করে এবং বিপুল শক্তি মুক্ত হয়। পৃথিবীতে এই প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রিতভাবে কাজে লাগাতে পারলে ভবিষ্যতে বিপুল পরিমাণ কম-কার্বন বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু ফিউশন রিঅ্যাক্টরে সেই প্রতিক্রিয়া শুরু করা এবং স্থিতিশীলভাবে চালিয়ে যাওয়া অত্যন্ত কঠিন। এবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রিন্সটন প্লাজমা ফিজিক্স ল্যাবরেটরির (PPPL) গবেষকেরা এমন একটি তাত্ত্বিক পথের কথা তুলে ধরেছেন, যা ফিউশন ঘটানোর জন্য প্রয়োজনীয় শক্তির চাহিদা কমানোর সম্ভাবনা দেখাচ্ছে।

ফিউশনের ক্ষেত্রে কেন গুরুত্বপূর্ণ গরম করার ক্রম?
ফিউশন ঘটানোর জন্য জ্বালানিকে অত্যন্ত উচ্চ তাপমাত্রায় উত্তপ্ত করতে হয়। এই অবস্থায় পদার্থ প্লাজমায় পরিণত হয়—যেখানে পরমাণুর ইলেকট্রন নিউক্লিয়াস থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে মুক্তভাবে চলাচল করে। একই সঙ্গে প্লাজমাকে যথেষ্ট ঘন রাখতে হয়, যাতে নিউক্লিয়াসগুলির মধ্যে সংঘর্ষ ও সংযোজনের সম্ভাবনা বাড়ে। এত দিন ধরে ফিউশন গবেষণায় প্লাজমার তাপমাত্রা, ঘনত্ব এবং শক্তি ধরে রাখার সময়কে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কিন্তু PPPL-এর গবেষকেরা দেখিয়েছেন, শুধু কতটা গরম বা ঘন করা হচ্ছে, তা নয়—কোন ক্রমে প্লাজমাকে উত্তপ্ত ও সংকুচিত করা হচ্ছে, সেটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তাঁদের গণনা অনুযায়ী, প্রথমে প্লাজমার তাপমাত্রা বাড়িয়ে পরে তার ঘনত্ব বৃদ্ধি করলে ফিউশন ইগনিশনের দিকে তুলনামূলক কম শক্তি-ব্যয়ী পথ পাওয়া যেতে পারে।
লসন মানদণ্ডের নতুন ব্যাখ্যা
গবেষণাটির কেন্দ্রে রয়েছে লসন মানদণ্ড (Lawson criterion)। ১৯৫০-এর দশকে প্রণীত এই ধারণা ব্যাখ্যা করে, ফিউশন বিক্রিয়াকে নিজের উৎপন্ন তাপে টিকিয়ে রাখতে প্লাজমার তাপমাত্রা, ঘনত্ব এবং শক্তি ধরে রাখার সময়ের মধ্যে কী ধরনের শর্ত প্রয়োজন। PPPL-এর লুইস ডেলগাডো-আপারিসিও, মাসায়ুকি ওনো এবং জোনাথন মেনার্ড এই কাঠামোকে আরও বিস্তৃত করে প্লাজমার আচরণকে প্রভাবিত করা একাধিক বিষয় একসঙ্গে বিবেচনা করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে ফিউশন বিক্রিয়ায় উৎপন্ন হিলিয়ামের জমা হওয়া, প্লাজমায় অমেধ্যের উপস্থিতি, সিনক্রোট্রন বিকিরণের মাধ্যমে শক্তি হারানো এবং প্লাজমা থেকে তাপ বেরিয়ে যাওয়া। এই বিষয়গুলি একসঙ্গে বিবেচনা করলে বাস্তব রিঅ্যাক্টরে ইগনিশন অর্জনের চ্যালেঞ্জ আরও স্পষ্ট হয়। গবেষণাটি ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ Physical Review Letters জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে।
সামান্য টাংস্টেনও বড় বাধা হতে পারে
গবেষণার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ফিউশন রিঅ্যাক্টরের অভ্যন্তরীণ দেয়ালে ব্যবহৃত টাংস্টেনের প্রভাব। অত্যন্ত উচ্চ তাপ সহ্য করতে পারে বলে উন্নত ফিউশন যন্ত্রে এই ধাতু ব্যবহার করার পরিকল্পনা রয়েছে। কিন্তু টাংস্টেনের অতি সামান্য অংশও প্লাজমায় মিশে গেলে পরিস্থিতি জটিল হতে পারে। গবেষকদের গণনা অনুযায়ী, প্লাজমায় টাংস্টেনের ঘনত্ব প্রতি ১০,০০০ কণার মধ্যে মাত্র একটির সমতুল্য হলেও ইগনিশনের জন্য প্রয়োজনীয় চাপ প্রায় দ্বিগুণ হতে পারে। অর্থাৎ রিঅ্যাক্টরের দেয়াল থেকে সামান্য অমেধ্য বেরিয়ে আসাও ফিউশন অর্জনের পথ কঠিন করে তুলতে পারে। এর সম্ভাব্য সমাধান হিসেবে তরল লিথিয়ামের আবরণ নিয়ে গবেষণার কথা বলা হয়েছে, যা প্লাজমায় টাংস্টেনের প্রবেশ কমাতে সাহায্য করতে পারে।
গবেষণাটি কতটা বাস্তবসম্মত?
এই আবিষ্কারের সম্ভাবনা আকর্ষণীয় হলেও এখনই একে ফিউশন শক্তির সমস্যার সমাধান বলা যাবে না। ‘আগে উত্তপ্ত, পরে ঘন’ পদ্ধতির সুবিধা আপাতত গাণিতিক বিশ্লেষণের ভিত্তিতে উঠে এসেছে; গবেষকেরা এখনও পরীক্ষাগারে এই নির্দিষ্ট পথের কার্যকারিতা সরাসরি প্রমাণ করেননি। পরবর্তী ধাপে কম্পিউটার সিমুলেশন এবং ভবিষ্যৎ পরীক্ষার মাধ্যমে দেখা দরকার, বাস্তব প্লাজমায় এই কৌশল কতটা কার্যকর। তা সত্ত্বেও গবেষণাটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে: ফিউশন অর্জনের জন্য শুধু আরও বেশি শক্তি জোগানোই কি একমাত্র পথ, নাকি সঠিক ক্রমে শক্তি প্রয়োগ করেও বাধা কমানো সম্ভব? সেই প্রশ্নের উত্তর ইতিবাচক হলে ভবিষ্যতের টোকামাক ও স্টেলারেটর রিঅ্যাক্টরের নকশা এবং পরিচালনার কৌশলে নতুন দিশা খুলতে পারে। সূর্যের শক্তিকে পৃথিবীতে কাজে লাগানোর দীর্ঘ যাত্রায় এটি আপাতত একটি আশাব্যঞ্জক তাত্ত্বিক পদক্ষেপ।
তথ্যসূত্র: Luis F. Delgado-Aparicio, Masayuki Ono ও Jonathan E. Menard, Generalized Lawson-Cordey-Mills Accessibility of Fusion Ignition, Physical Review Letters, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬। DOI: https://doi.org/10.1103/mmc9-nzfx