সমুদ্রের ১০ মিটার গভীরেও বিদ্যুৎ তৈরি করল সৌরকোষ, চার্জ হল লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি
সূর্যের আলো ব্যবহার করে বিদ্যুৎ তৈরির প্রযুক্তি সাধারণত খোলা আকাশের নীচে বা এমন জায়গায় ব্যবহার করা হয়, যেখানে পর্যাপ্ত আলো পৌঁছয়। কিন্তু সমুদ্রের ১০ মিটার গভীরে, যেখানে জলের কারণে সূর্যালোকের একটি বড় অংশ ইতিমধ্যেই হারিয়ে যায়, সেখানেও কি সৌরকোষ দিয়ে বিদ্যুৎ তৈরি করা সম্ভব? চিনের একদল গবেষকের পরীক্ষায় মিলেছে তারই আশাব্যঞ্জক উত্তর। দক্ষিণ চিন সাগরে পরীক্ষা করে তাঁরা দেখিয়েছেন, বিশেষভাবে তৈরি সৌরকোষ সমুদ্রের নীচেও আলো সংগ্রহ করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে এবং সেই বিদ্যুৎ দিয়ে লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি চার্জ করা সম্ভব।

এই আবিষ্কারের গুরুত্ব শুধু নতুন ধরনের সৌরকোষ তৈরির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সমুদ্রের নীচে বৈজ্ঞানিক গবেষণার জন্য ব্যবহৃত সেন্সর, ক্যামেরা, যোগাযোগব্যবস্থা এবং অন্যান্য বৈদ্যুতিক যন্ত্রকে দীর্ঘ সময় ধরে সচল রাখা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ। জলের নীচে কাজ করতে পারে এমন সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা ভবিষ্যতে এই সমস্যার কিছুটা সমাধান করতে পারে। তবে পরীক্ষায় সাফল্য পাওয়া আর বাস্তব সমুদ্রে দীর্ঘমেয়াদে নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহ করা এক বিষয় নয়। নতুন গবেষণাটি সেই সম্ভাবনার দিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন চিনের ইউনান বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা। তাঁদের তৈরি সৌরকোষ দক্ষিণ চিন সাগরে ওয়েইঝৌ দ্বীপের উপকূলের কাছে পরীক্ষা করা হয়। দূরনিয়ন্ত্রিত রোবটের সাহায্যে সৌরকোষগুলিকে সমুদ্রের পৃষ্ঠ থেকে ২ মিটার, ৬ মিটার এবং ১০ মিটার গভীরে নিয়ে যাওয়া হয়। পরীক্ষার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হল, সমুদ্রের ১০ মিটার নীচেও সৌরকোষগুলি পরিমাপযোগ্য পরিমাণে বিদ্যুৎ সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছিল। এই গভীরতায় পৌঁছনোর পরেও আলো থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষমতা বজায় থাকা জলের নীচে সৌরশক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনাকে নতুন করে সামনে এনেছে।
সমুদ্রের নীচে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করা কঠিন কেন, তা বুঝতে হলে জলের মধ্যে আলোর আচরণ সম্পর্কে জানা দরকার। সূর্যের আলো সমুদ্রের পৃষ্ঠে পৌঁছনোর পর তার একাংশ প্রতিফলিত হয়ে ফিরে যায়। যে আলো জলের মধ্যে প্রবেশ করে, তারও একটি অংশ শোষিত হয় এবং আরেকটি অংশ বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে গভীরতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সাধারণত আলোর পরিমাণ কমতে থাকে। বিশেষ করে দৃশ্যমান আলোর বিভিন্ন রং সমুদ্রের জলের মধ্যে সমান দূরত্ব অতিক্রম করতে পারে না। লাল আলোর অনেকটাই তুলনামূলক অগভীর স্তরেই হারিয়ে যায়। অন্যদিকে, নীল ও সবুজ তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো তুলনামূলক বেশি গভীরে পৌঁছতে পারে।
এই কারণেই গবেষকেরা সাধারণ সৌরকোষের নকশা অনুসরণ না করে এমন একটি উপাদান ব্যবহার করেছেন, যা জলের নীচে পৌঁছনো আলোর বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারে। তাঁদের তৈরি সৌরকোষের মূল উপাদান হল লেড হ্যালাইড পেরোভস্কাইট। পেরোভস্কাইট হল একটি নির্দিষ্ট স্ফটিক-গঠনসম্পন্ন পদার্থের শ্রেণি, যার বিভিন্ন রূপ আলো শোষণ করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কাজে ব্যবহার করা যায়। এই গবেষণায় পেরোভস্কাইটের সঙ্গে পলিহেক্সামিথিলিন গুয়ানিডিন হাইড্রোক্লোরাইড নামের একটি পলিমার মেশানো হয়েছিল। গবেষকদের উদ্দেশ্য ছিল, এই পলিমারের সাহায্যে সৌরকোষের মধ্যে ইলেকট্রন আটকে রাখার ক্ষমতা বাড়ানো, যাতে আলোকশক্তিকে আরও কার্যকরভাবে বৈদ্যুতিক শক্তিতে রূপান্তর করা যায়।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক ধারণা হল ‘ব্যান্ড গ্যাপ’। সহজভাবে বললে, কোনও অর্ধপরিবাহী পদার্থের মধ্যে ইলেকট্রনকে এমন অবস্থায় নিয়ে যেতে কতটা শক্তি প্রয়োজন, তা বোঝাতে ব্যান্ড গ্যাপ ধারণাটি ব্যবহার করা হয়। সৌরকোষের ক্ষেত্রে এই বৈশিষ্ট্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি নির্ধারণ করে কোন তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো পদার্থটি শোষণ করতে পারবে। গবেষকেরা এমন বৈশিষ্ট্যের সৌরকোষ তৈরি করার চেষ্টা করেছেন, যা সমুদ্রের প্রায় ৫ থেকে ১০ মিটার গভীরে পৌঁছনো আলোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এই স্তরে প্রধানত ৪০০ থেকে ৬০০ ন্যানোমিটার তরঙ্গদৈর্ঘ্যের নীল-সবুজ আলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
সমুদ্রে পরীক্ষা চালানোর আগে গবেষকেরা পরীক্ষাগারেই সৌরকোষগুলির নকশা উন্নত করেন। সেখানে সমুদ্রের নীচের আলোকপরিস্থিতি অনুকরণ করে পরীক্ষা চালানো হয়। এই পরীক্ষায় সৌরকোষের শক্তি রূপান্তরের দক্ষতা প্রায় ৩৫ শতাংশে পৌঁছেছিল। শক্তি রূপান্তরের দক্ষতা বলতে বোঝায়, সৌরকোষের উপর পড়া আলোকশক্তির কতটা অংশ বিদ্যুৎশক্তিতে রূপান্তরিত হচ্ছে। তবে এই প্রায় ৩৫ শতাংশ দক্ষতার ফলটি পরীক্ষাগারে অনুকরণ করা আলোকপরিস্থিতিতে পাওয়া গিয়েছিল। একে সমুদ্রের ১০ মিটার গভীরে বাস্তবে অর্জিত দক্ষতা হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।
পরীক্ষাগারের ছোট সৌরকোষ থেকে তুলনামূলক বড় মডিউল তৈরির দিকেও এগিয়েছেন গবেষকেরা। তাঁদের তৈরি পরীক্ষামূলক মডিউলের ক্ষেত্রফল ছিল ১১৫ বর্গসেন্টিমিটার। এরপর সেটিকে দূরনিয়ন্ত্রিত রোবটের সাহায্যে সমুদ্রের বিভিন্ন গভীরতায় নিয়ে গিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষমতা পরীক্ষা করা হয়। এই পরীক্ষার ফলাফল থেকে বোঝা যায়, গভীরতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সৌরকোষে সংগৃহীত বিদ্যুতের পরিমাণ কমেছে। কিন্তু ১০ মিটার গভীরতাতেও বিদ্যুৎ সংগ্রহ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়নি।
সমুদ্রের ২ মিটার গভীরতায় সৌরকোষগুলি ১,৪১৬ মিলিওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ সংগ্রহ করেছিল। ৬ মিটার গভীরতায় এই পরিমাণ কমে হয় ৭৫২ মিলিওয়াট-ঘণ্টা। আর ১০ মিটার গভীরতায় সংগ্রহ করা বিদ্যুতের পরিমাণ ছিল ৩২৪ মিলিওয়াট-ঘণ্টা। অর্থাৎ, সবচেয়ে গভীর পরীক্ষাস্থলে বিদ্যুৎ সংগ্রহের পরিমাণ অগভীর স্তরের তুলনায় অনেকটাই কম ছিল। তবু এই ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এর মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে যে বিশেষভাবে তৈরি সৌরকোষ সীমিত আলোতেও জলের নীচে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে।
এই বিদ্যুৎ ব্যবহার করে পরীক্ষায় লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি চার্জ করা হয়েছিল। গবেষণার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ব্যাটারিগুলিতে এতটা শক্তি সঞ্চিত হয়েছিল যে সেগুলি দিয়ে একটি এলইডি সাইনবোর্ড জ্বালানো সম্ভব হয়। প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়েছে, সৌরকোষগুলি মাত্র দুই ঘণ্টার মধ্যে ব্যাটারি চার্জ করার মতো শক্তি সংগ্রহ করতে পেরেছিল। তবে এই ফলাফলকে সব ধরনের ব্যাটারি, সব আবহাওয়া বা সব সমুদ্রের পরিবেশে একই রকম চার্জিং ক্ষমতার নিশ্চয়তা হিসেবে দেখা উচিত নয়। পরীক্ষার পরিস্থিতি এবং ব্যবহৃত ব্যাটারির নির্দিষ্ট বিবরণ ছাড়া সেই তুলনা করা সম্ভব নয়।
এই প্রযুক্তির সম্ভাব্য ব্যবহার নিয়ে গবেষকদের আগ্রহের কারণও স্পষ্ট। সমুদ্রের নীচে স্থাপন করা সেন্সর ও ডিটেক্টর দীর্ঘ সময় ধরে তাপমাত্রা, পরিবেশগত অবস্থা বা অন্যান্য বৈজ্ঞানিক বিষয় পর্যবেক্ষণের কাজে লাগতে পারে। ক্যামেরা, যোগাযোগব্যবস্থা এবং সমুদ্রের নীচে শব্দ পর্যবেক্ষণকারী যন্ত্রের মতো সরঞ্জামও বিদ্যুতের উপর নির্ভরশীল। এ ধরনের যন্ত্রে নিয়মিত ব্যাটারি বদলানো বা বিদ্যুৎ সরবরাহের ব্যবস্থা করা কঠিন হতে পারে। জলের নীচেই আলো থেকে বিদ্যুৎ সংগ্রহ করার ব্যবস্থা কার্যকর হলে কিছু ক্ষেত্রে সেই নির্ভরতা কমানো সম্ভব হতে পারে। তবে এগুলি আপাতত সম্ভাব্য প্রয়োগ, সব ক্ষেত্রে কার্যকর প্রমাণিত প্রযুক্তি নয়।
গবেষকেরা অনুমান করেছেন, তাঁদের তৈরি সৌরকোষ প্রায় সাড়ে পাঁচ বছর পর্যন্ত কাজ করতে পারে। এই সময়কালটি একটি অনুমান; একে সমুদ্রের প্রতিকূল পরিবেশে সাড়ে পাঁচ বছর ধরে সফলভাবে চালানো হয়েছে, এমন পরীক্ষার ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করা যাবে না। দীর্ঘমেয়াদে প্রযুক্তিটি কতটা নির্ভরযোগ্য হবে, তা বুঝতে আরও বাস্তব পরীক্ষা এবং স্থায়িত্বের মূল্যায়ন প্রয়োজন। বিশেষ করে সমুদ্রের নীচে বিভিন্ন গভীরতায় আলোর পরিবর্তন এবং দীর্ঘ সময় ধরে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ধারাবাহিকতা সম্পর্কে আরও তথ্য গুরুত্বপূর্ণ হবে।
গবেষণাটির মূল সাফল্য তাই সমুদ্রের নীচে সৌরবিদ্যুতের সম্ভাবনা প্রদর্শন করা। এটি প্রচলিত সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার বিকল্প হিসেবে অবিলম্বে বৃহৎ পরিসরে ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত, এমন দাবি করার সুযোগ দেয় না। বরং সীমিত আলোতে কাজ করতে সক্ষম সৌরকোষের নকশা এবং বাস্তব সমুদ্রে তার কার্যকারিতা পরীক্ষার মাধ্যমে গবেষকেরা ভবিষ্যতের সামুদ্রিক শক্তি প্রযুক্তির জন্য একটি নতুন পথ খুলে দিয়েছেন। আগামী দিনে এই ধরনের সৌরকোষের কার্যকারিতা, স্থায়িত্ব এবং ব্যবহারিক সীমাবদ্ধতা আরও স্পষ্ট হলে সমুদ্রের নীচে স্বয়ংসম্পূর্ণ বিদ্যুৎ সরবরাহকারী যন্ত্র তৈরির ক্ষেত্রে প্রযুক্তিটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।
তথ্যসূত্র :
1\. Jess Cockerill, ScienceAlert, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ — Scientists Successfully Test Underwater Solar Cells 32 Feet Below The South China Sea।
3\. গবেষণা সম্পর্কে সংবাদ ও গবেষক-উদ্ধৃতি: [SciMex — Sub-sea solar: New solar cells can work 10 metres below the ocean’s surface]।
2\. Ma et al., Joule (২০২৬)। গবেষণাপত্রের DOI: [10.1016/j.joule.2026.102672]