পুনর্জন্মের দাবি: ১,৬৭৮টি ঘটনা বিশ্লেষণে আকস্মিক মৃত্যুর পর শিশুর জন্ম নিয়ে চমকপ্রদ তথ্য
শিশুদের কথিত পূর্বজন্মের স্মৃতি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা চলছে। সম্প্রতি ১,৬৭৮টি ঘটনা বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা মৃত্যুর ধরন ও শিশুর জন্মের মধ্যবর্তী সময়ে একটি অদ্ভুত পরিসংখ্যানগত সম্পর্ক খুঁজে পেয়েছেন। তবে এই পর্যবেক্ষণ পুনর্জন্মের অস্তিত্বের প্রমাণ নয়।
মানুষের মৃত্যুর পর কি তার স্মৃতির সঙ্গে সম্পর্কিত কোনও অভিজ্ঞতা পরবর্তী প্রজন্মের শিশুদের মধ্যে দেখা যায়? পুনর্জন্ম নিয়ে এই প্রশ্নের কোনও প্রতিষ্ঠিত বৈজ্ঞানিক উত্তর নেই। তবে দীর্ঘদিন ধরে এমন কিছু শিশুর অভিজ্ঞতা নথিবদ্ধ করে আসছেন গবেষকেরা, যাদের পরিবারের দাবি, তারা এমন মানুষ, স্থান বা ঘটনার কথা বলে, যেগুলির সঙ্গে তাদের বর্তমান জীবনের প্রত্যক্ষ পরিচয় নেই। এই বিবরণগুলির বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও, সেগুলিকে পদ্ধতিগতভাবে বিশ্লেষণ করার চেষ্টা মনোবিজ্ঞানের গবেষণায় একটি বিশেষ ক্ষেত্র তৈরি করেছে। সম্প্রতি প্রকাশিত একটি বৃহৎ পরিসরের বিশ্লেষণে এমনই কিছু ঘটনার মধ্যে সময়ের ব্যবধান নিয়ে একটি অপ্রত্যাশিত পরিসংখ্যানগত প্রবণতা সামনে এসেছে।

আমেরিকার ইউনিভার্সিটি অব ভার্জিনিয়ার ডিভিশন অব পারসেপচুয়াল স্টাডিজ ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে শিশুদের কথিত পূর্বজন্মের স্মৃতির দাবি সংক্রান্ত ঘটনা সংগ্রহ করছে। এই সংগ্রহে রয়েছে এমন শিশুদের বিবরণ, যাদের পরিবারের সদস্যেরা জানান, তারা আগের কোনও জীবন সম্পর্কে কথা বলে। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য মনে রাখা দরকার: কোনও শিশুর বক্তব্যকে পূর্বজন্মের স্মৃতি হিসেবে বর্ণনা করা এবং সেই বক্তব্য যে সত্যিই পূর্বজন্মের স্মৃতি, তা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রতিষ্ঠা করা এক বিষয় নয়। গবেষণার বিষয় হল প্রথমত নথিবদ্ধ দাবিগুলির বৈশিষ্ট্য ও সেগুলির মধ্যে পরিসংখ্যানগত সম্পর্ক খুঁজে দেখা। এই পদ্ধতিতে পাওয়া কোনও মিল নিজে থেকেই অতিপ্রাকৃত ব্যাখ্যাকে সত্য প্রমাণ করে না।
কগনিটিভ নিউরোসায়েন্টিস্ট সাঈদেহ সাদেঘির নেতৃত্বে গবেষকদল এই সংগ্রহের ১,৬৭৮টি ঘটনা বিশ্লেষণ করেছেন। এই ঘটনাগুলির প্রত্যেকটিতে অনুসন্ধানকারীরা এমন একজন নির্দিষ্ট মৃত ব্যক্তিকে চিহ্নিত করেছিলেন, যার জীবন সম্পর্কে তথ্যের সঙ্গে শিশুটির বক্তব্যের মিল রয়েছে বলে তাঁদের মনে হয়েছিল। অর্থাৎ, গবেষণাটি কেবল শিশুদের অস্পষ্ট বা সাধারণ স্মৃতিচারণের বিবরণ নিয়ে করা হয়নি; বরং এমন ঘটনাগুলিকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যেখানে একটি নির্দিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে শিশুর বক্তব্যের যোগসূত্র স্থাপনের চেষ্টা করা হয়েছিল। এই নির্বাচনের ফলে ঘটনাগুলির মধ্যে তুলনা করা সম্ভব হয়েছে, যদিও কোন ব্যক্তির সঙ্গে কোন শিশুর বক্তব্যের মিল রয়েছে, তা নির্ধারণের প্রক্রিয়াটিও গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা।
বিশ্লেষণের জন্য প্রয়োজনীয় তারিখ স্পষ্টভাবে পাওয়া গিয়েছিল ১,৩১৯টি ঘটনায়। গবেষকেরা ওই ঘটনাগুলিতে চিহ্নিত মৃত ব্যক্তির মৃত্যুর তারিখ এবং সংশ্লিষ্ট শিশুর জন্মের তারিখের মধ্যবর্তী সময় হিসাব করেন। দেখা যায়, এই ব্যবধানের মধ্যম মান ছিল ১৬ মাস। মধ্যম মান বলতে বোঝায়, সাজানো তথ্যের ঠিক মাঝখানে থাকা মানটি; এটি গড় সময়ের সমার্থক নয়। অর্থাৎ, এই ঘটনাগুলির অর্ধেকের ক্ষেত্রে ব্যবধান ১৬ মাসের সমান বা তার কম এবং বাকি অর্ধেকের ক্ষেত্রে ১৬ মাসের সমান বা তার বেশি ছিল। এই পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়, নথিবদ্ধ ঘটনাগুলিতে মৃত্যু ও জন্মের মধ্যবর্তী সময় সাধারণত কয়েক বছরের বদলে মাসের হিসাবে পরিমাপযোগ্য ছিল। তবে এই ফলাফল থেকে সব শিশুর অভিজ্ঞতার জন্য একই সময়সীমা নির্ধারণ করা যায় না।
গবেষণার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পর্যবেক্ষণটি সামনে আসে মৃত্যুর ধরন বিবেচনা করার পর। যেসব ক্ষেত্রে মৃত্যু আকস্মিক ছিল—যেমন দুর্ঘটনা, হিংসা অথবা অপ্রত্যাশিত চিকিৎসাজনিত সংকট—সেখানে মৃত ব্যক্তির মৃত্যু ও সংশ্লিষ্ট শিশুর জন্মের ব্যবধান ছিল প্রায় ১২ মাস। অন্যদিকে, যেসব মৃত্যু আগে থেকেই প্রত্যাশিত ছিল, সেগুলির ক্ষেত্রে এই ব্যবধান ছিল প্রায় ২১ মাস। অর্থাৎ, দুই ধরনের ঘটনার মধ্যে ব্যবধানের পার্থক্য প্রায় নয় মাস। এটি এমন একটি পরিসংখ্যানগত সম্পর্ক, যা গবেষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। তবে এখানে ১২ ও ২১ মাসকে সংশ্লিষ্ট সব ঘটনার নির্দিষ্ট নিয়ম হিসেবে দেখা উচিত নয়; এগুলি গবেষণায় পাওয়া দুই গোষ্ঠীর মধ্যবর্তী ব্যবধানের বর্ণনা।
এই পার্থক্যটি কেন গুরুত্বপূর্ণ, তা বোঝার জন্য গবেষণার প্রশ্নটি স্পষ্ট করা দরকার। গবেষকেরা পুনর্জন্মের অস্তিত্ব প্রমাণ করার উদ্দেশ্যে মৃত্যুর পর আত্মা কত দিনে নতুন শরীরে প্রবেশ করে, এমন কোনও সময়সীমা নির্ধারণ করেননি। বরং তাঁরা জানতে চেয়েছেন, নথিবদ্ধ ঘটনাগুলিতে মৃত্যুর ধরন এবং পরবর্তী শিশুর জন্মের সময়ের মধ্যে কোনও নিয়মিত সম্পর্ক দেখা যায় কি না। আকস্মিক মৃত্যুর ক্ষেত্রে ব্যবধান তুলনামূলক কম হওয়ার পর্যবেক্ষণ সেই প্রশ্নের একটি পরিসংখ্যানগত উত্তর দেয়। কিন্তু কেন এই সম্পর্ক দেখা যাচ্ছে, তার উত্তর এই ফলাফল একা দিতে পারে না। কোনও ঘটনার সঙ্গে অন্য একটি ঘটনার নিয়মিত সম্পর্ক পাওয়া এবং তাদের মধ্যে কারণ-সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করা বৈজ্ঞানিকভাবে আলাদা বিষয়।
গবেষকেরা পরিবারের পারস্পরিক পরিচয় এবং পুনর্জন্ম সম্পর্কে তাঁদের বিশ্বাসের মতো বিষয়গুলিও বিবেচনায় নিয়েছেন। কারণ, কোনও পরিবারের সদস্যেরা আগে থেকেই একে অপরকে চিনলে একটি শিশুর বক্তব্যের সঙ্গে নির্দিষ্ট মৃত ব্যক্তির জীবনের মিল খুঁজে পাওয়ার সুযোগ ভিন্ন হতে পারে। একইভাবে, পুনর্জন্মে বিশ্বাসী পরিবার কোনও শিশুর অস্বাভাবিক বক্তব্যকে যেভাবে ব্যাখ্যা করবে, তা এই ধারণায় বিশ্বাস না করা পরিবারের ব্যাখ্যা থেকে আলাদা হতে পারে। এই বিষয়গুলি হিসাবের মধ্যে নেওয়ার পরেও মৃত্যুর ধরন ও জন্মের ব্যবধানের সম্পর্কটি বজায় ছিল বলে গবেষকেরা জানিয়েছেন। এটি পর্যবেক্ষণটিকে আরও মনোযোগযোগ্য করে তোলে, যদিও কয়েকটি সম্ভাব্য প্রভাব বিবেচনায় নেওয়া মানেই সব ধরনের পক্ষপাত দূর হয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যায় না।
এখানেই গবেষণাটির একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এই ঘটনাগুলির তথ্য মূলত পরিবারের বিবরণ এবং অনুসন্ধানকারীদের মূল্যায়নের উপর নির্ভরশীল। শিশুটি ঠিক কী বলেছিল, কখন বলেছিল, তার বক্তব্যের সঙ্গে অতীতের কোনও ব্যক্তির জীবনের কতটা মিল রয়েছে এবং সেই মিল কীভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে—এসব বিষয়ের উপর ফলাফলের নির্ভরযোগ্যতা প্রভাবিত হতে পারে। যদি কোনও শিশুর বক্তব্য শোনার পর তার সঙ্গে মেলে এমন একজন মৃত ব্যক্তিকে খোঁজা হয়, তাহলে মিল খুঁজে পাওয়ার প্রক্রিয়ায় অনিচ্ছাকৃত পক্ষপাত ঢুকে পড়ার সুযোগ থাকে। আবার পরিবারের স্মৃতিচারণ সময়ের সঙ্গে বদলাতেও পারে। তাই নথিবদ্ধ বিবরণকে বিশ্লেষণ করা সম্ভব হলেও, সেগুলিকে প্রত্যক্ষভাবে যাচাই করা তথ্যের সমতুল্য ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।
আকস্মিক মৃত্যুর ঘটনাগুলি মানুষের মনে বেশি দাগ কাটে এবং সেগুলি নিয়ে পরিবার ও পরিচিতদের মধ্যে বেশি আলোচনা হয়—এমন সম্ভাবনাও গবেষকেরা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেছেন। অপ্রত্যাশিত মৃত্যুর কথা বেশি আলোচিত হলে কোনও শিশুর বক্তব্যের সঙ্গে সেই মৃত ব্যক্তির জীবনের যোগসূত্র খুঁজে পাওয়া তুলনামূলক সহজ হতে পারে। ফলে আকস্মিক মৃত্যুর পর জন্মের ব্যবধান কম দেখা যাওয়ার পেছনে স্মৃতি, সামাজিক আলোচনা কিংবা ঘটনা বাছাইয়ের প্রভাব থাকতে পারে। তবে গবেষণাটি এই ব্যাখ্যাগুলির কোনও একটিকে নিশ্চিত কারণ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেনি। এগুলি এমন সম্ভাব্য ব্যাখ্যা, যেগুলি ভবিষ্যৎ গবেষণায় পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
পরিসংখ্যানগত ফলটির আরেকটি দিকও গুরুত্বপূর্ণ। গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, মৃত্যুর ধরন সংক্রান্ত এই প্রভাব সময়ের ব্যবধানের মোট বৈচিত্র্যের মাত্র ২–৩ শতাংশ ব্যাখ্যা করে। সহজ ভাষায়, কোন ব্যক্তির মৃত্যুর পর কত মাসের ব্যবধানে শিশুটির জন্ম হয়েছে, তার পার্থক্যের খুব সামান্য অংশই এই সম্পর্কের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা যায়। বাকি বৈচিত্র্যের কারণ এই পর্যবেক্ষণ থেকে বোঝা যায় না। তাই দুই গোষ্ঠীর ব্যবধানের পার্থক্য চোখে পড়ার মতো হলেও, সামগ্রিকভাবে ঘটনাগুলির সময় নির্ধারণের ক্ষেত্রে মৃত্যুর ধরন খুব শক্তিশালী ব্যাখ্যাকারী নয়। এই পরিসংখ্যান গবেষণাটির গুরুত্ব কমায় না; বরং ফলাফলকে কতটা সীমিত অর্থে ব্যাখ্যা করা উচিত, তা বুঝতে সাহায্য করে।
এ ধরনের গবেষণাকে আরও শক্তিশালী করতে ভবিষ্যতে তথ্য সংগ্রহ ও যাচাইয়ের পদ্ধতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে। শিশুর বক্তব্য কখন প্রথম নথিবদ্ধ হয়েছে, সংশ্লিষ্ট মৃত ব্যক্তিকে শনাক্ত করার আগে কী কী তথ্য জানা ছিল এবং পরিবারগুলির মধ্যে পূর্বপরিচয় কতটা ছিল—এসব বিষয় যথাসম্ভব স্পষ্টভাবে নথিবদ্ধ করা গেলে ফলাফল মূল্যায়ন করা সহজ হবে। একই সঙ্গে, গবেষকেরা কীভাবে একটি নির্দিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে শিশুর বক্তব্যের মিল নির্ধারণ করছেন, সেই প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতাও জরুরি। তবে বর্তমান গবেষণার বিবরণ থেকে বলা যায় না যে এই সব পদ্ধতি ইতিমধ্যেই প্রয়োগ করা হয়েছে বা ভবিষ্যতে নির্দিষ্ট কোনও ফল পাওয়া নিশ্চিত।
সর্বোপরি, ১,৬৭৮টি ঘটনার এই বিশ্লেষণ পুনর্জন্মের বৈজ্ঞানিক প্রমাণ হাজির করেনি। এটি বরং একটি সীমিত কিন্তু আকর্ষণীয় প্রশ্ন সামনে এনেছে: কথিত পূর্বজন্মের স্মৃতির ঘটনাগুলিতে মৃত্যুর ধরন এবং শিশুর জন্মের সময়ের মধ্যে যে সম্পর্ক দেখা যাচ্ছে, তার ব্যাখ্যা কী? উত্তর খুঁজতে হলে অস্বাভাবিক মনে হওয়া পরিসংখ্যানকে সরাসরি অতিপ্রাকৃত সিদ্ধান্তের দিকে নিয়ে যাওয়ার বদলে তথ্যের গুণমান, সম্ভাব্য পক্ষপাত এবং বিকল্প ব্যাখ্যাগুলিকে একে একে পরীক্ষা করতে হবে। বিজ্ঞানের শক্তি কেবল বিস্ময়কর পর্যবেক্ষণ খুঁজে পাওয়ায় নয়, সেই পর্যবেক্ষণ থেকে ঠিক কতটা সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যায়, তা সততার সঙ্গে নির্ধারণ করাতেও।
সূত্র: ইউনিভার্সিটি অব ভার্জিনিয়া, ডিভিশন অব পারসেপচুয়াল স্টাডিজ; Psychology of Consciousness: Theory, Research, and Practice, ২০২৬।