চাঁদের কাছে বিকিরণ যতটা বেশি হওয়ার কথা, ততটা নয়! Artemis I অভিযানে নতুন তথ্য
মহাকাশে পৃথিবীর সুরক্ষামূলক চৌম্বকক্ষেত্রের বাইরে গেলে মহাকাশচারীরা উচ্চশক্তির কণার বিকিরণের মুখোমুখি হন। কিন্তু চাঁদের কাছে এই বিকিরণের মাত্রা পৃথিবীর কাছাকাছি কক্ষপথের তুলনায় ঠিক কতটা বেশি? NASA-র Artemis I অভিযানে সংগৃহীত তথ্য এই প্রশ্নের নতুন উত্তর দিয়েছে। ২০২২ সালের নভেম্বরে ও ডিসেম্বরে চাঁদের পাশ দিয়ে উড়ে যাওয়ার সময় চালকবিহীন Orion মহাকাশযানে দুটি মানবদেহের আদলে তৈরি পুতুলের মধ্যে ১০ হাজারেরও বেশি ক্ষুদ্র বিকিরণ শনাক্তকারী বসানো হয়েছিল। প্রাথমিক পরিমাপে দেখা যায়, চাঁদের কাছে বিকিরণের মাত্রা পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথের তুলনায় বেশি হলেও প্রত্যাশার তুলনায় বৃদ্ধির পরিমাণ খুব বেশি ছিল না। এই ফলাফল ভবিষ্যতের চন্দ্রাভিযানে মহাকাশচারীদের বিকিরণ-ঝুঁকি বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।

এই অভিযানে বিশেষ ভূমিকা নেয় পোল্যান্ডের Institute of Nuclear Physics-এর বিজ্ঞানীদের তৈরি লিথিয়াম ফ্লোরাইড স্ফটিক ডিটেক্টর। মহাকাশ থেকে আসা আয়নিত কণা এই স্ফটিকের মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় তার পরমাণুর সুশৃঙ্খল বিন্যাসে অতি ক্ষুদ্র ত্রুটি তৈরি করে। নীল আলো দিয়ে স্ফটিককে উত্তেজিত করলে ওই ত্রুটিগুলি থেকে লাল প্রতিপ্রভা নির্গত হয়, যা ফ্লুরোসেন্স মাইক্রোস্কোপে পর্যবেক্ষণ করা যায়। এই আলোকচিহ্ন বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা কণার গতিপথ এবং তার বিকিরণজনিত প্রভাব সম্পর্কে তথ্য পান। প্রচলিত কিছু প্লাস্টিক ডিটেক্টরের মতো রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় স্ফটিকের পৃষ্ঠ খোদাই করার প্রয়োজন হয় না। ফলে এই প্রযুক্তি বিকিরণের সূক্ষ্ম চিহ্ন শনাক্ত করার একটি বিকল্প পদ্ধতি হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
চাঁদের কাছে বিকিরণের ধরন বোঝার জন্য পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্রের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পৃথিবীর Van Allen বিকিরণ বলয়ে আটকে থাকা কমশক্তির প্রোটন নিম্ন কক্ষপথে মহাকাশচারীদের মোট বিকিরণমাত্রায় উল্লেখযোগ্য অবদান রাখে। চাঁদের কাছে এই অবদান কার্যত অনুপস্থিত, কিন্তু সেখানে দূর মহাকাশ থেকে আসা উচ্চশক্তির গ্যালাকটিক কসমিক রশ্মির প্রভাব বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এই কণাগুলি মানবদেহের অনেকটা গভীর পর্যন্ত প্রবেশ করতে পারে এবং বিভিন্ন গভীরতায় তুলনামূলকভাবে সমানভাবে শক্তি জমা করতে পারে। গবেষকেরা আরও জানিয়েছেন, তাঁদের স্ফটিক ডিটেক্টরের পরিমাপ প্রচলিত ট্র্যাক ডিটেক্টরের ফলাফলের সঙ্গে তুলনীয় শক্তি-জমার পরিসরে সর্বোচ্চ প্রায় ১৫ শতাংশের মধ্যে মিলেছে। পাশাপাশি, প্রচলিত ডিটেক্টরের শনাক্তকরণসীমার নিচে থাকা কিছু কণার চিহ্নও তাঁরা রেকর্ড করেছেন। তবে এই ফলাফলকে সব ধরনের মহাজাগতিক বিকিরণ শনাক্ত করার ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ নির্ভুলতার প্রমাণ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।
এই গবেষণা ভবিষ্যতের চন্দ্রাভিযান এবং দীর্ঘমেয়াদি মহাকাশযাত্রায় বিকিরণ পরিমাপের উন্নত পদ্ধতি তৈরির সম্ভাবনা দেখাচ্ছে। ছোট আকারের লিথিয়াম ফ্লোরাইড ডিটেক্টর বিভিন্ন ধরনের কণা ও শক্তির বিকিরণ শনাক্ত করতে সাহায্য করে। নির্দিষ্ট আইসোটোপ দিয়ে সমৃদ্ধ স্ফটিক ব্যবহার করে নিউট্রন বিকিরণ সম্পর্কেও তথ্য সংগ্রহ করা যায়। তবে বিকিরণ শনাক্ত করার উন্নত প্রযুক্তি তৈরি হওয়া আর মহাকাশচারীদের নিরাপত্তার সব সমস্যার সমাধান হওয়া এক বিষয় নয়; দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি নির্ধারণে আরও পরিমাপ, বিশ্লেষণ ও সুরক্ষা-পরিকল্পনা প্রয়োজন। গবেষণাটি Radiation Measurements পত্রিকায় ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ প্রকাশিত হয়েছে। Artemis I-এর এই তথ্য ভবিষ্যতে মানুষকে চাঁদে পাঠানোর পরিকল্পনায় মহাকাশের বিকিরণ পরিবেশ সম্পর্কে আরও নির্ভরযোগ্য ধারণা তৈরিতে সাহায্য করবে।
তথ্যসূত্র: Bilski, P. et al. “Application of LiF fluorescent nuclear track detectors for measurements of cosmic radiation at the lunar orbit within the MARE experiment.” Radiation Measurements, 1 September 2026. [DOI: 10.1016/j.radmeas.2026.107806](https://doi.org/10.1016/j.radmeas.2026.107806?utm_source=chatgpt.com)