রাসায়নিক তৈরির গোপন রহস্য উন্মোচন, একটি পরিবর্তনেই সাফল্য ১৬% থেকে ৯৭%!

রাসায়নিক শিল্পে একটি বিক্রিয়া সফল হবে কি না, তা নির্ভর করে শুধু উপাদান, তাপমাত্রা কিংবা বিদ্যুতের ওপর নয়—নির্ভর করে ইলেকট্রোডের ঠিক পাশের অতি ক্ষুদ্র অঞ্চলের অম্লত্বের ওপরও। দক্ষিণ কোরিয়ার সিউল ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির গবেষকরা দেখিয়েছেন, এই স্থানীয় অম্লত্ব (Local pH) নিয়ন্ত্রণ করে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাসায়নিক বিক্রিয়ায় কাঙ্ক্ষিত উৎপাদের নির্বাচনী হার প্রায় ১৬ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৯৭ শতাংশে নিয়ে যাওয়া সম্ভব। গবেষণাটিতে বিজ্ঞানীরা বিদ্যুৎ ও অক্সিজেন ব্যবহার করে মূল্যবান জৈব রাসায়নিক তৈরির একটি পদ্ধতি পরীক্ষা করেছেন, যেখানে বাইরে থেকে আলাদা করে পারঅক্সাইডজাতীয় জারক রাসায়নিক যোগ করার প্রয়োজন কমে যায়। এই আবিষ্কার ভবিষ্যতে রাসায়নিক উৎপাদনকে আরও দক্ষ ও পরিবেশবান্ধব করার নতুন পথ দেখাচ্ছে।
গবেষণাটির মূল বিষয় হলো জৈব ইলেকট্রোসংশ্লেষণ (Organic Electrosynthesis)—যে পদ্ধতিতে বিদ্যুৎ ব্যবহার করে জৈব যৌগ তৈরি করা হয়। সাধারণত ইলেকট্রোডের কাছে রাসায়নিক বিক্রিয়া চলার সময় হাইড্রোজেন আয়নের উৎপাদন বা খরচের কারণে অম্লত্ব দ্রুত বদলে যায়। ফলে পুরো দ্রবণের pH স্বাভাবিক বা নিরপেক্ষ থাকলেও ইলেকট্রোডের আশপাশের পরিবেশ অত্যন্ত অম্লীয় কিংবা ক্ষারীয় হয়ে উঠতে পারে। গবেষকদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ক্যাথোডের কাছে pH প্রায় ১১ এবং অ্যানোডের কাছে প্রায় ২.৫ পর্যন্ত পৌঁছতে পারে। এই পরিবর্তন প্রয়োজনীয় সক্রিয় অক্সিজেনজাত কণার আচরণ বদলে দেয়, বিক্রিয়ার গতি কমায় এবং তৈরি হওয়া কাঙ্ক্ষিত পদার্থকে ভেঙেও ফেলতে পারে। অর্থাৎ, রাসায়নিক বিক্রিয়ার ফল নির্ধারণে দ্রবণের সামগ্রিক বৈশিষ্ট্যের পাশাপাশি ইলেকট্রোডের কাছের ক্ষুদ্র পরিবেশও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সমস্যাটির সমাধানে গবেষকরা এমন একটি রিঅ্যাক্টর তৈরি করেন, যেখানে দুটি ইলেকট্রোডের মধ্যবর্তী দূরত্ব কমানো হয় এবং তাদের মাঝ দিয়ে বিদ্যুৎ পরিবাহী তরল প্রবাহিত করা হয়। এর ফলে স্থানীয় অম্লত্বের চরম পরিবর্তন নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয় এবং কাঙ্ক্ষিত রাসায়নিক উৎপাদনের দক্ষতা বাড়ে। পরীক্ষায় ইলেকট্রোডের দূরত্ব ২০ মিলিমিটার থেকে কমিয়ে ৪ মিলিমিটার করায় উৎপাদনের হার প্রায় ২.২ গুণ বৃদ্ধি পায়। আবার পরীক্ষিত সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ তরল প্রবাহের হারে উৎপাদনের হার বেড়েছিল প্রায় ১৪ গুণ। এই পদ্ধতিতে গবেষকরা ১৮ ধরনের কিটোন যৌগ থেকে ল্যাকটোন তৈরি করেন এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ যৌগ ε-ক্যাপ্রোল্যাকটোন ৮২ শতাংশ উৎপাদন-ফলনে (Yield) পান। ল্যাকটোন জৈব-বিয়োজ্য প্লাস্টিক ও পলিইউরেথেন তৈরির কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। একই নীতিতে ছয় ধরনের অ্যালকিন থেকে ইপক্সাইডও তৈরি করা হয়েছে, যা আঠা, সুরক্ষামূলক প্রলেপ, ইলেকট্রনিক উপকরণ এবং ওষুধশিল্পে গুরুত্বপূর্ণ।
এই গবেষণার গুরুত্ব শুধু একটি রাসায়নিক বিক্রিয়ার সাফল্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি রাসায়নিক রিঅ্যাক্টর তৈরির প্রচলিত ধারণাকেও নতুনভাবে ভাবতে শেখায়। অক্সিজেন ও বিদ্যুৎ ব্যবহার করে, স্বাভাবিক তাপমাত্রা ও বায়ুচাপে মূল্যবান রাসায়নিক তৈরির এই পদ্ধতি ভবিষ্যতে বিপজ্জনক জারক পদার্থের ব্যবহার এবং রাসায়নিক বর্জ্য কমানোর সুযোগ তৈরি করতে পারে। বিদ্যুতের উৎস হিসেবে নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহার করা গেলে পরিবেশগত সুবিধাও বাড়তে পারে। তবে পরীক্ষাগারের এই ফলাফলকে বৃহৎ শিল্পে প্রয়োগ করার আগে উৎপাদন খরচ, দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা এবং বাণিজ্যিক পরিসরে কার্যকারিতা যাচাই করা প্রয়োজন। গবেষণাটি Journal of the American Chemical Society পত্রিকায় ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ প্রকাশিত হয়েছে। গবেষণার মূল বার্তা স্পষ্ট—রাসায়নিক বিক্রিয়াকে আরও কার্যকর করতে শুধু কী দিয়ে বিক্রিয়া ঘটানো হচ্ছে, তা জানলেই চলবে না; অণুগুলি ঠিক কোন পরিবেশে বিক্রিয়া করছে, সেটিও নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
তথ্যসূত্র: Min, S. et al. “Local pH Control Promotes Oxygen-Atom Transfer Electrosynthesis.” Journal of the American Chemical Society, 4 September 2026. DOI: 10.1021/jacs.6c12994