কাগজ ভাঁজ করার কৌশলেই তৈরি হবে শক্তপোক্ত আশ্রয়! নির্মাণপ্রযুক্তিতে নতুন দিশা দেখাল MIT
উপকরণ কম, ওজন হালকা, অথচ কাঠামো অনেক বেশি দৃঢ়—কাগজ ভাঁজ করার প্রাচীন শিল্প অরিগামির কৌশল কাজে লাগিয়ে স্থাপত্য নির্মাণে নতুন সম্ভাবনা দেখালেন MIT-এর গবেষকেরা। এই প্রযুক্তি ভবিষ্যতে দুর্যোগবিধ্বস্ত এলাকায় দ্রুত আশ্রয় নির্মাণ থেকে শুরু করে বিমান তৈরির ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
কাগজের একটি সমতল পাতকে বিশেষ কৌশলে ভাঁজ করে জটিল ত্রিমাত্রিক আকৃতি তৈরি করা যায়। জাপানি শিল্প অরিগামির এই পরিচিত ধারণাকেই এবার বড় আকারের নির্মাণকাজে প্রয়োগ করেছেন ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি বা MIT-এর গবেষকেরা। তাঁদের তৈরি পদ্ধতিতে ধাতব পাতের ছোট ছোট মডিউল ভাঁজ করে জুড়ে দেওয়া হয়। এভাবেই তৈরি হয় হালকা অথচ দৃঢ় একটি কাঠামো, যা নিজের ভার বহন করার পাশাপাশি নির্দিষ্ট ধরনের বাহ্যিক ভারও সামলাতে পারে।

কাগজ ভাঁজ করার অরিগামি কৌশল এবার ধাতব কাঠামো নির্মাণে! MIT-এর গবেষকেরা এমন এক প্রযুক্তি তৈরি করেছেন, যেখানে ভাঁজ করা ধাতব পাত জুড়ে তৈরি হচ্ছে হালকা অথচ দৃঢ় কাঠামো। কম উপকরণে এই প্রযুক্তি ভবিষ্যতে দুর্যোগের পরে দ্রুত আশ্রয় নির্মাণ থেকে শুরু করে বিমান তৈরিতেও নতুন সম্ভাবনা খুলে দিতে পারে। ছবি : AI নির্মিত।
গবেষণাটির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো, এই কাঠামো তৈরিতে প্রচলিত কিছু নির্মাণপদ্ধতির তুলনায় কম উপকরণ লাগে। গবেষকদের কম্পিউটার সিমুলেশনে দেখা গেছে, তাঁদের নকশায় তৈরি কাঠামো কয়েকটি প্রচলিত অরিগামিভিত্তিক কাঠামোর তুলনায় প্রায় ৩.৫ গুণ বেশি দৃঢ়তা দেখায়। একই সঙ্গে এতে উপকরণের প্রয়োজন প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কম। তবে এই তুলনা নির্দিষ্ট কিছু বিকল্প নকশার সঙ্গে করা হয়েছে; সব ধরনের প্রচলিত ভবনের সঙ্গে নয়।
কীভাবে কাজ করে অরিগামিভিত্তিক নির্মাণপ্রযুক্তি?
এই গবেষণার পেছনে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে শিল্পী ও বিজ্ঞানী রন রেশের ১৯৬০-এর দশকে তৈরি ভাঁজভিত্তিক জ্যামিতিক নকশা। তাঁর তৈরি পুনরাবৃত্ত বহুভুজাকার নকশাগুলি ভাঁজ করে জটিল ত্রিমাত্রিক কাঠামো তৈরি করা সম্ভব।
MIT-এর গবেষকেরা সেই ধারণাকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গিয়েছেন। একটি বড় পাতকে একবারে ভাঁজ করে পুরো কাঠামো তৈরির বদলে তাঁরা আলাদা আলাদা ছোট মডিউল তৈরি করেন। প্রতিটি মডিউল নির্দিষ্ট জ্যামিতিক নকশা অনুযায়ী কাটা ও ভাঁজ করা হয়। এরপর সেগুলিকে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত করে তৈরি করা হয় একটি ত্রিমাত্রিক কাঠামো।
গবেষণার প্রধান লেখক আলফোনসো পারা রুবিও টোমিহিরো তাচির গবেষণাগারে কাজ করার সময় রেশের নকশার দুটি ট্রাইপড-আকৃতির একককে একত্র করে একটি দৃঢ় মডিউল তৈরির পদ্ধতি বিকাশ করেন। এর বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, সঠিকভাবে জোড়া লাগানোর পর মডিউলটি আর স্বাধীনভাবে ভাঁজ হয়ে আকৃতি পরিবর্তন করতে পারে না। প্রকৌশলের ভাষায়, এর স্বাধীন গতির মাত্রা শূন্য—অর্থাৎ এটি একটি স্থিতিশীল বিন্যাসে আটকে থাকে।
এমন একাধিক মডিউল পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হলে তৈরি হয় আন্তঃসংযুক্ত বিমের জালিকা। এই জ্যামিতিক বিন্যাস কাঠামোটিকে দৃঢ়তা ও স্থিতিশীলতা দেয়। ফলে ভেতরে অতিরিক্ত স্তম্ভের প্রয়োজন ছাড়াই নির্দিষ্ট নকশায় ভারবহনকারী কাঠামো তৈরি করা সম্ভব হয়।
নকশা থেকে নির্মাণ—সবই কম্পিউটারের সাহায্যে
এ ধরনের কাঠামোর প্রতিটি বহুভুজাকার অংশ হাতে নকশা করা অত্যন্ত জটিল। প্রতিটি অংশকে এমনভাবে তৈরি করতে হয়, যাতে সেটি সহজে ভাঁজ করা যায় এবং অন্য অংশের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পুরো কাঠামোকে স্থিতিশীল রাখে।

এই সমস্যা সমাধানে গবেষকেরা একটি স্বয়ংক্রিয় কম্পিউটার-ভিত্তিক নকশাপদ্ধতি তৈরি করেছেন। MIT-এর সেন্টার ফর বিটস অ্যান্ড অ্যাটমসের গবেষক এরিক স্ট্র্যান্ডের সহযোগিতায় তাঁরা এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলেন, যা কাঙ্ক্ষিত কাঠামোর নকশাকে ছোট ছোট সমস্যায় ভাগ করে সমাধান করে। প্রথমে প্রতিটি মডিউলের ভাঁজযোগ্যতা যাচাই করা হয়, তারপর সেগুলিকে একত্র করে সম্পূর্ণ কাঠামোর নকশা তৈরি করা হয়।
এই নকশার ফাইল সরাসরি CNC মিলিং মেশিনে পাঠানো যায়। যন্ত্রটি অ্যালুমিনিয়ামের মতো সমতল পাত থেকে প্রয়োজনীয় অংশ কেটে দেয়। পরে সেগুলি নির্দিষ্ট রেখা ধরে ভাঁজ করে জোড়া লাগানো হয়।
এই ব্যবস্থায় নকশা, উপাদান তৈরি এবং চূড়ান্ত সংযোজনের মধ্যে সমন্বয় রাখা সহজ হয়। ফলে জটিল কাঠামো তৈরিতে ভুলের আশঙ্কা কমানো এবং উৎপাদনপ্রক্রিয়াকে দ্রুততর করার সুযোগ তৈরি হয়।
বড় নির্মাণকাজেও কি সম্ভব এই প্রযুক্তির ব্যবহার?
গবেষকেরা শুধু ছোট মডেল তৈরি করেই থেমে থাকেননি। এই প্রযুক্তির কার্যকারিতা ও বড় আকারে প্রয়োগের সম্ভাবনা দেখাতে তাঁরা ভাঁজ করা অ্যালুমিনিয়ামের অংশ দিয়ে প্রায় ২৩ ফুট লম্বা একটি ভাস্কর্য তৈরি করেছেন। সেটি সম্প্রতি বোস্টন পাবলিক লাইব্রেরির একটি অ্যাট্রিয়ামের ছাদ থেকে ঝুলিয়ে প্রদর্শন করা হয়েছে।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, নির্মাণকাজে পেশাদার অভিজ্ঞতা নেই এমন একটি দলও কয়েক দিনের মধ্যে কাঠামোটি জোড়া লাগাতে সক্ষম হয়েছিল। এর জন্য বড় আকারের ওয়েল্ডিং যন্ত্রপাতির প্রয়োজন হয়নি; সাধারণ হাতে ব্যবহারের সরঞ্জাম দিয়েই কাজটি করা গেছে।
অবশ্য একটি ঝুলন্ত ভাস্কর্য তৈরি করা আর মানুষের বসবাসের উপযোগী, নিরাপদ ভবন নির্মাণ করা এক বিষয় নয়। ভবনের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব, বাতাসের চাপ, ভূমিকম্প, আগুন, আর্দ্রতা, সংযোগস্থলের ক্লান্তিজনিত ক্ষয় এবং স্থানীয় নির্মাণবিধি মেনে চলার মতো বিষয়ও পরীক্ষা করতে হবে।
দুর্যোগের পরে দ্রুত আশ্রয় তৈরিতে নতুন সম্ভাবনা
ভূমিকম্প, বন্যা বা অন্য কোনও প্রাকৃতিক দুর্যোগের পরে দ্রুত আশ্রয় নির্মাণ করা অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু ভারী নির্মাণসামগ্রী পরিবহণ, দক্ষ শ্রমিকের অভাব এবং নির্মাণের দীর্ঘ সময়—সবই ত্রাণকার্যে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
অরিগামিভিত্তিক এই পদ্ধতি সেই সমস্যার একটি সম্ভাব্য সমাধান দিতে পারে। কাঠামোর অংশগুলি সমতল ধাতব পাত থেকে তৈরি করে ভাঁজ অবস্থায় পরিবহণ করা সম্ভব। ঘটনাস্থলে পৌঁছে সেগুলিকে নির্দিষ্ট নিয়মে জুড়ে দ্রুত কাঠামো দাঁড় করানো যেতে পারে। কম উপকরণে হালকা কাঠামো তৈরির সুবিধা পরিবহণের খরচও কমাতে পারে।
এ ছাড়া বিমান ও মহাকাশযানের হালকা উপাদান, মডিউলার রোবট, শব্দ শোষণকারী প্যানেল এবং ভবনের সম্মুখভাগ তৈরিতেও এই প্রযুক্তি কাজে লাগানোর সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে দুর্যোগে বসবাসের উপযোগী আশ্রয় হিসেবে ব্যবহারের আগে কাঠামোগুলির নিরাপত্তা, আবহাওয়া সহনশীলতা, তাপ নিরোধক ক্ষমতা, বায়ু চলাচল এবং বাস্তব পরিস্থিতিতে ভারবহন ক্ষমতা যাচাই করা জরুরি।
গবেষণার গুরুত্ব কোথায়?
নির্মাণশিল্পে জটিল কাঠামো তৈরির জন্য প্রায়ই ভারী উপাদান, বিশেষ যন্ত্রপাতি এবং দক্ষ শ্রমিকের প্রয়োজন হয়। অরিগামিভিত্তিক এই প্রযুক্তি সেই প্রক্রিয়ার একটি বিকল্প পথ দেখাচ্ছে। এখানে কাঠামোর জ্যামিতিই তার দৃঢ়তা তৈরির অন্যতম প্রধান উপাদান। অর্থাৎ শুধু বেশি ধাতু ব্যবহার করে শক্তি বাড়ানোর বদলে উপাদানকে কীভাবে ভাঁজ করে এবং কীভাবে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে, সেটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
গবেষণাটির সঙ্গে যুক্ত MIT-এর অধ্যাপক নিল গার্শেনফেল্ডের মতে, ধাতু ভাঁজ করার এই পদ্ধতি এখন পরীক্ষাগারের বাইরেও বড় কাঠামো তৈরির সম্ভাবনা দেখাচ্ছে। তবে প্রযুক্তিটিকে নিয়মিত নির্মাণকাজে ব্যবহার করার আগে আরও বড় স্থাপত্য কাঠামো তৈরি করে পরীক্ষা করার পরিকল্পনা রয়েছে গবেষকদের।
এই গবেষণা দেখায়, ভবিষ্যতের নির্মাণশিল্পে শক্তি, ওজন ও উপকরণের দক্ষ ব্যবহারের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করতে জ্যামিতিক নকশা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। কাগজ ভাঁজ করার পরিচিত একটি ধারণা এবার ধাতুর সাহায্যে বড় আকারের প্রকৌশল কাঠামো তৈরির নতুন পথ খুলে দিচ্ছে।
তথ্যসূত্র :
১. MIT News, Origami-based construction method yields lightweight, load-bearing structures on architectural scales, ২৭ অক্টোবর ২০২৬।
২. গবেষণাপত্র: Resch Tessellations as Stiff, Folded Modular Shells, International Journal of Solids and Structures।
৩. গবেষণাপত্রের লিঙ্ক: https://journals.sagepub.com/doi/10.1177/09560599261494767
৪. MIT-এর মূল প্রতিবেদন: https://news.mit.edu/2026/origami-based-construction-method-yields-lightweight-load-bearing-structures-architecture-1027