ক্ষয়িষ্ণু হাঁটুর চিকিৎসায় নতুন আশা, প্রাকৃতিক লুব্রিসিনের বিকল্প তৈরি করলেন বিজ্ঞানীরা
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাঁটু, কোমর ও কাঁধের জয়েন্টে ব্যথা, শক্ত হয়ে যাওয়া এবং চলাফেরায় অসুবিধার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। এর পেছনে অন্যতম কারণ অস্টিওআর্থ্রাইটিস, যেখানে জয়েন্টের তরুণাস্থি ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এবার এই সমস্যার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক নিয়ে নতুন সম্ভাবনার কথা জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই প্রকৌশলী। তাঁদের তৈরি একটি কৃত্রিম পলিমার প্রাকৃতিক পিচ্ছিলকারক প্রোটিনের অনুকরণে কাজ করে জয়েন্টের ঘর্ষণ কমাতে পারে। প্রযুক্তিটি এখন হাঁটুর অস্টিওআর্থ্রাইটিস এবং শুষ্ক চোখের চিকিৎসায় মানুষের ওপর পরীক্ষার পর্যায়ে প্রবেশ করছে।

গবেষণাটির সঙ্গে যুক্ত বিজ্ঞানীরা হলেন ডেভিড পুটনাম (David Putnam) এবং লরেন্স বোনাসার (Lawrence Bonassar)। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে তাঁরা এমন একটি কৃত্রিম উপাদান তৈরির চেষ্টা করেছেন, যা শরীরের প্রাকৃতিক পিচ্ছিলকারক লুব্রিসিনের কাজ অনুকরণ করতে পারে। তাঁদের লক্ষ্য, শরীর যখন পর্যাপ্ত প্রাকৃতিক পিচ্ছিলকারক তৈরি করতে পারে না, তখন তার বিকল্প হিসেবে এমন একটি উপাদান ব্যবহার করা, যা সংযোগস্থলের ঘর্ষণ কমাতে সাহায্য করবে।
কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ৭ অক্টোবর ২০২৬-এ প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই প্রযুক্তির সম্ভাব্য ব্যবহার যাচাই করতে অস্ট্রেলিয়ায় হাঁটুর অস্টিওআর্থ্রাইটিসের চিকিৎসার জন্য এবং কানাডায় শুষ্ক চোখের সমস্যার জন্য পৃথক মানব-পরীক্ষা শুরু হওয়ার পর্যায়ে রয়েছে। এই পরীক্ষাগুলির ফল ইতিবাচক হলে ভবিষ্যতে নতুন চিকিৎসার পথ খুলতে পারে। তবে এখনই একে প্রতিষ্ঠিত চিকিৎসা বলা যাবে না; মানুষের ক্ষেত্রে এর কার্যকারিতা ও নিরাপত্তা পরীক্ষার ফলের ওপর নির্ভর করবে।

আমাদের জয়েন্টের হাড়ের প্রান্তে থাকা তরুণাস্থি চলাফেরার সময় হাড়ের পৃষ্ঠকে মসৃণভাবে নড়াচড়া করতে সাহায্য করে। এই ব্যবস্থায় লুব্রিসিন নামে একটি বিশেষ প্রোটিন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এটি এক ধরনের গ্লাইকোপ্রোটিন, অর্থাৎ প্রোটিনের সঙ্গে শর্করার অংশ যুক্ত থাকে। লুব্রিসিন জয়েন্টের পৃষ্ঠে পিচ্ছিল পরিবেশ বজায় রাখতে সাহায্য করে, ফলে দুটি পৃষ্ঠের মধ্যে সরাসরি ঘর্ষণ কম হয়।
বয়স বাড়লে অথবা জয়েন্টে আঘাত লাগলে লুব্রিসিনের উৎপাদন কমে যেতে পারে। তখন পৃষ্ঠের মধ্যে ঘর্ষণ বেড়ে তরুণাস্থির ক্ষতির ঝুঁকি বাড়ে। এই প্রক্রিয়া অস্টিওআর্থ্রাইটিসের সঙ্গে সম্পর্কিত। রোগটি বিশ্বজুড়ে ৫০ কোটিরও বেশি মানুষকে প্রভাবিত করে বলে কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে ৩ কোটি ২০ লক্ষেরও বেশি প্রাপ্তবয়স্ক এই রোগে আক্রান্ত।
বিজ্ঞানীদের তৈরি কৃত্রিম পলিমারটির বিশেষত্ব হলো, এর গঠনকে দুটি আলাদা কার্যকর অংশের সমন্বয়ে তৈরি করা হয়েছে। পলিমার বলতে বোঝায় অনেকগুলি ছোট রাসায়নিক একক যুক্ত হয়ে তৈরি বড় অণু। এই ক্ষেত্রে একটি অংশ শরীরের টিস্যু বা কলার পৃষ্ঠের সঙ্গে আটকে থাকতে সাহায্য করে, আর অন্য অংশ জল ধরে রাখতে সক্ষম।
বিষয়টি সহজভাবে বোঝা যায় একটি সুতো বা দড়ির সঙ্গে তুলনা করলে। সুতোর এক প্রান্ত যদি কোনও পৃষ্ঠের সঙ্গে শক্তভাবে আটকে থাকে এবং অন্য প্রান্ত জল ধরে রাখতে পারে, তাহলে পুরো গঠনটি পৃষ্ঠের ওপর একটি পাতলা জলীয় স্তর বজায় রাখতে সাহায্য করতে পারে। বিজ্ঞানীদের নকশায় টিস্যুর সঙ্গে যুক্ত হওয়া অংশটি পলিমারকে নির্দিষ্ট পৃষ্ঠে আটকে রাখে। অন্য অংশটি জল ধরে রেখে পৃষ্ঠকে পিচ্ছিল রাখতে সাহায্য করে। এই সমন্বয়ই কৃত্রিম উপাদানটির কার্যকারিতার মূল চাবিকাঠি।
এই ধারণার পেছনে শুধু রাসায়নিক উপাদান নির্বাচন নয়, অণুর গঠনও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। পুটনাম ও বোনাসারের গবেষণায় দেখা যায়, জল ধরে রাখতে পারে এমন অণু তৈরি করাই যথেষ্ট নয়; সেই অণুকে তরুণাস্থির পৃষ্ঠে আটকে রাখার ব্যবস্থাও দরকার। দুটি কার্যকর অংশকে নির্দিষ্ট বিন্যাসে যুক্ত করেই তাঁরা কাঙ্ক্ষিত বৈশিষ্ট্য অর্জন করেন।
২০১৯ সালে Proceedings of the National Academy of Sciences (PNAS) সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণায় বিজ্ঞানীরা গরুর তরুণাস্থির নমুনার ওপর পলিমারটি পরীক্ষা করেন। পরীক্ষার আগে নমুনা থেকে প্রাকৃতিক লুব্রিসিন সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এরপর কৃত্রিম পলিমার প্রয়োগের ফলে ঘর্ষণ সহগ প্রায় ০.৩৯ থেকে কমে ০.০৯-এ নেমে আসে। ঘর্ষণ সহগ হলো দুটি পৃষ্ঠের মধ্যে ঘর্ষণের মাত্রা বোঝানোর একটি পরিমাপ; সাধারণভাবে এর মান কম হলে ঘর্ষণও কম হয়।
গবেষণায় দেখা যায়, এই ফল প্রাকৃতিক লুব্রিসিন দিয়ে চিকিৎসা করা তরুণাস্থির ফলের কাছাকাছি। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পলিমারের দুটি অংশ আলাদাভাবে পরীক্ষা করলে কোনওটিই একই কার্যকারিতা দেখায়নি। নির্দিষ্ট বিন্যাসে দুটি অংশকে যুক্ত করলেই কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া গিয়েছিল। অর্থাৎ, উপাদানটির রাসায়নিক বৈশিষ্ট্যের পাশাপাশি অণুর স্থাপত্য বা গঠনও গুরুত্বপূর্ণ।
বিজ্ঞানীরা বিশেষভাবে নজর দিয়েছিলেন ‘বাউন্ডারি ফ্রিকশন’ বা সংস্পর্শজনিত ঘর্ষণের ওপর। বাস্তবে কোনও পৃষ্ঠই পুরোপুরি মসৃণ নয়। দুটি পৃষ্ঠ একে অপরের ওপর দিয়ে সরে যাওয়ার সময় তাদের ক্ষুদ্র উঁচু অংশগুলির সরাসরি সংস্পর্শ ঘটে। এই সংস্পর্শে যে প্রতিরোধ তৈরি হয়, সেটিই বাউন্ডারি ফ্রিকশন। গবেষকদের লক্ষ্য ছিল এই ঘর্ষণ কমানো, কারণ জয়েন্টের পৃষ্ঠের ক্ষতির সঙ্গে এর সম্পর্ক রয়েছে।
২০২০ সালে ACS Applied Materials and Interfaces সাময়িকীতে প্রকাশিত দ্বিতীয় গবেষণায় তাঁরা পরীক্ষা করেন, পলিমারের দুটি অংশের দৈর্ঘ্য তার কার্যকারিতাকে কীভাবে প্রভাবিত করে। এজন্য তাঁরা পলিমারের আটটি ভিন্ন সংস্করণ তৈরি করেন। জল ধরে রাখার অংশ এবং টিস্যুর সঙ্গে যুক্ত হওয়া অংশের দৈর্ঘ্য বদলে প্রতিটি সংস্করণের কার্যকারিতা তুলনা করা হয়।
এই পরীক্ষায় টিস্যুর সঙ্গে যুক্ত হওয়া অংশটির দৈর্ঘ্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বলে দেখা যায়। গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, ওই অংশে অ্যামিন গ্রুপের সংখ্যা প্রায় ২৪ হলে কার্যকর ভারসাম্য তৈরি হয়েছিল। অ্যামিন গ্রুপ হলো নির্দিষ্ট ধরনের নাইট্রোজেনযুক্ত রাসায়নিক গোষ্ঠী, যা অণুর অন্যান্য অংশের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ায় ভূমিকা রাখতে পারে। সংখ্যা অতিরিক্ত বেড়ে গেলে অণুগুলি তরুণাস্থির পৃষ্ঠে পর্যাপ্ত জায়গা না পাওয়ায় কার্যকারিতা কমতে পারে। আবার অংশটি খুব ছোট হলেও পলিমার যথেষ্ট শক্তভাবে আটকে থাকতে পারে না।
অন্যদিকে, জল ধরে রাখার অংশটি একটি ন্যূনতম আকার অতিক্রম করার পর তার দৈর্ঘ্য বাড়ানো কার্যকারিতায় তুলনামূলকভাবে কম প্রভাব ফেলেছিল। এই ফল ভবিষ্যতে একই ধরনের উপাদান নকশা করার সময় গবেষকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কারণ এতে পলিমারের কোন অংশটি সবচেয়ে বেশি মনোযোগ দিয়ে পরিবর্তন করা দরকার, সে সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়।
এই প্রযুক্তির আরেকটি সম্ভাব্য সুবিধা হলো, প্রাকৃতিক লুব্রিসিন বড় পরিসরে উৎপাদন করা কঠিন এবং ব্যয়বহুল। সে কারণে বহু বছর ধরে আশাব্যঞ্জক প্রাণী-পরীক্ষা হওয়া সত্ত্বেও এটি চিকিৎসাক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হয়নি। তুলনামূলকভাবে সহজে তৈরি করা যায় এমন কৃত্রিম বিকল্প এই সীমাবদ্ধতা কাটাতে সাহায্য করতে পারে। তবে উৎপাদন সহজ হলেই কোনও উপাদান মানুষের জন্য নিরাপদ বা কার্যকর হয়ে যায় না; সেগুলি পৃথকভাবে পরীক্ষা করা জরুরি।
গবেষণার ভিত্তিতে তৈরি প্রযুক্তিটি থেকে প্লেরিয়ন থেরাপিউটিকস (Pleryon Therapeutics) নামে একটি নতুন সংস্থারও সূচনা হয়েছে। কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন পিএইচডি গবেষক ঝেশুন ‘জেসন’ সান (Zhexun “Jason” Sun), যিনি ২০১৮ সালে পিএইচডি সম্পন্ন করেন, সংস্থাটির সহ-প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা। তাঁর গবেষণাকাজ থেকেই বর্তমান উপাদানটির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি ঘটে।
ভবিষ্যতে এই পলিমার শুধু হাঁটুর সমস্যাতেই নয়, শরীরের অন্যান্য অংশে যেখানে দুটি টিস্যুর মধ্যে মসৃণভাবে চলাচল প্রয়োজন, সেখানেও কাজে লাগতে পারে বলে গবেষকেরা মনে করছেন। চোখের কর্নিয়ার পৃষ্ঠে পিচ্ছিলতা বজায় রাখা থেকে শুরু করে পেশি ও টেনডনের পারস্পরিক চলাচলে সহায়তা করা—বিভিন্ন সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। চোয়ালের জয়েন্টের ব্যথা বা টেম্পোরোম্যান্ডিবুলার জয়েন্টের (TMJ) সমস্যাতেও ভবিষ্যতে এর ব্যবহার পরীক্ষা করা যেতে পারে।
তবে এসব সম্ভাব্য ব্যবহারকে এখনই নিশ্চিত চিকিৎসা হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। ২০১৯ সালের গবেষণায় গরুর তরুণাস্থির নমুনায় ঘর্ষণ কমানোর ফল পাওয়া গিয়েছিল; সেটি মানুষের হাঁটুতে একই মাত্রার উপকার প্রমাণ করে না। একইভাবে, শুষ্ক চোখের চিকিৎসায় কার্যকারিতা প্রতিষ্ঠা করতে মানব-পরীক্ষার ফল প্রয়োজন। দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা, উপযুক্ত প্রয়োগপদ্ধতি এবং বাস্তব চিকিৎসায় উপকারের মাত্রা সম্পর্কেও আরও তথ্য দরকার।
সব মিলিয়ে, কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের কাজ দেখায়, শরীরের প্রাকৃতিক পিচ্ছিলকারক প্রোটিনের গঠন ও কাজ অনুকরণ করে নতুন চিকিৎসা-উপাদান তৈরির একটি সম্ভাবনাময় পথ তৈরি করা যায়। কৃত্রিম পলিমারটি পরীক্ষাগারে তরুণাস্থির ঘর্ষণ কমাতে সক্ষম হয়েছে এবং এখন মানুষের ওপর পরীক্ষার দিকে এগোচ্ছে। সেই পরীক্ষার ফলই নির্ধারণ করবে, এই প্রযুক্তি ভবিষ্যতে অস্টিওআর্থ্রাইটিস ও শুষ্ক চোখের চিকিৎসায় কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে।
তথ্যসূত্র:
১. Laura Reiley, A synthetic answer to the squeak in aging joints, Cornell Chronicle, ৭ অক্টোবর ২০২৬।
https://news.cornell.edu/stories/2026/10/synthetic-answer-squeak-aging-joints
২. Proceedings of the National Academy of Sciences (PNAS), ২০১৯ সালের গবেষণা।
https://www.pnas.org/doi/10.1073/pnas.1900716116
৩. ACS Applied Materials and Interfaces, ২০২০ সালের গবেষণা।
https://pubs.acs.org/aamick/article/12/1/330/478730/Influence-of-Block-Length-on-Articular-Cartilage
Congrats.