পোকামাকড়ের উড়তে শেখার ইতিহাস কি ৮ কোটি বছর বদলে গেল?
একটি ক্ষুদ্র জীবাশ্ম। দৈর্ঘ্য এক মিলিমিটারেরও কম। প্রায় এক শতাব্দী আগে স্কটল্যান্ডের একটি প্রাচীন জীবাশ্মক্ষেত্র থেকে উদ্ধার হওয়া এই নমুনাটিই দীর্ঘদিন ধরে পোকামাকড়ের বিবর্তনের ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে। বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল, পৃথিবীতে উড়তে সক্ষম পোকামাকড়ের আবির্ভাব অন্তত ৪১ কোটি বছর আগে ঘটেছিল। সেই ধারণার অন্যতম ভিত্তি ছিল Rhyniognatha hirsti নামের এই জীবাশ্ম। কিন্তু আধুনিক অণুবীক্ষণ প্রযুক্তিতে সেটিকে নতুন করে পরীক্ষা করার পর গবেষকেরা জানিয়েছেন, জীবাশ্মটির প্রকৃত পরিচয় এখনও নিশ্চিত নয়। ফলে পোকামাকড়ের উড্ডয়নের ইতিহাস সম্পর্কে এত দিন ধরে প্রচলিত সময়রেখা বদলে যেতে পারে।
পোকামাকড় পৃথিবীর অন্যতম বৈচিত্র্যময় প্রাণীগোষ্ঠী। তাদের বিবর্তন, দেহের গঠন এবং উড়তে শেখার ইতিহাস বোঝা জীববিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাক্ষেত্র। বিশেষ করে উড্ডয়ন পোকামাকড়ের বিবর্তনে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য, যা তাদের পৃথিবীর বিভিন্ন পরিবেশে বিস্তারের ইতিহাস বুঝতে সাহায্য করে। কিন্তু এই ক্ষমতার সূচনা ঠিক কখন হয়েছিল, তার উত্তর খুঁজতে বিজ্ঞানীদের নির্ভর করতে হয় প্রাচীন জীবাশ্মের ওপর। কারণ জীবাশ্মের দেহগঠন বিশ্লেষণ করেই বোঝা যায়, অতীতের কোনো প্রাণী আধুনিক প্রাণীগোষ্ঠীর সঙ্গে কতটা সম্পর্কিত ছিল। সেই কারণেই Rhyniognatha-র পরিচয় নিয়ে নতুন গবেষণা শুধু একটি জীবাশ্মের শ্রেণিবিন্যাসের প্রশ্ন নয়, বরং পোকামাকড়ের বিবর্তনের সময়কাল নির্ধারণের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ।
Rhyniognatha hirsti আবিষ্কৃত হয় ১৯২৬ সালে উত্তর স্কটল্যান্ডের Rhynie Chert নামের একটি বিখ্যাত জীবাশ্মক্ষেত্রে। এই অঞ্চলটি প্রায় ৪০৮ মিলিয়ন বছর আগের, অর্থাৎ প্রায় ৪০ কোটি ৮০ লক্ষ বছর পুরোনো ডেভোনিয়ান যুগের একটি জলাভূমি পরিবেশের অবশেষ সংরক্ষণ করে রেখেছে। সেই প্রাচীন পরিবেশের উদ্ভিদ ও বিভিন্ন প্রাণীর দেহাবশেষ সেখানে অসাধারণ সূক্ষ্মতায় সংরক্ষিত হয়েছে। Rhyniognatha-র ক্ষেত্রে অবশ্য সম্পূর্ণ প্রাণীদেহ পাওয়া যায়নি। জীবাশ্মটিতে সংরক্ষিত রয়েছে কেবল একটি প্রাচীন সন্ধিপদী প্রাণীর মাথার অংশ। সন্ধিপদী বা Arthropod বলতে সেই প্রাণীগোষ্ঠীকে বোঝায়, যাদের দেহে সন্ধিযুক্ত পা এবং শক্ত বহিঃকঙ্কাল থাকে। পোকামাকড়, মাকড়সা, কাঁকড়া ও শতপদী এই গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত।

আবিষ্কারের পর দীর্ঘদিন জীবাশ্মটি বিশেষ আলোচনায় আসেনি। ২০০৪ সালে গবেষকেরা এর চোয়ালের গঠন বিশ্লেষণ করে উড়ন্ত পোকামাকড়ের সঙ্গে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সাদৃশ্য খুঁজে পান। সেই পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে Rhyniognatha-কে প্রাচীনতম পরিচিত উড়ন্ত পোকামাকড়ের একটি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এর ফলে পোকামাকড়ের উড্ডয়নের ইতিহাস অন্তত ৪১০ মিলিয়ন বছর আগে পর্যন্ত প্রসারিত হয়েছিল বলে ধারণা তৈরি হয়। পরবর্তী সময়ে বিবর্তনীয় গবেষণায় এই জীবাশ্মটি বিশেষ গুরুত্ব পায়। কারণ কোনো প্রাণীগোষ্ঠীর বিবর্তনের সময়কাল নির্ধারণ করতে বিজ্ঞানীরা জীবাশ্মের নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যকে সময়ের ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করেন। এই পদ্ধতিতে জীবাশ্মের বয়স ও পরিচয় বিবর্তনবৃক্ষের বিভিন্ন শাখার সম্ভাব্য উৎপত্তিকাল নির্ধারণে সাহায্য করে।
তবে Rhyniognatha-র পরিচয় নিয়ে সন্দেহ তৈরি হতে শুরু করে। কিছু গবেষক প্রস্তাব করেন, এটি পোকামাকড় না হয়ে প্রাচীন কোনো শতপদী বা Myriapod গোষ্ঠীর প্রাণীও হতে পারে। Myriapod হলো বহু সন্ধিযুক্ত দেহ ও একাধিক জোড়া পা-যুক্ত সন্ধিপদী প্রাণীদের একটি গোষ্ঠী, যার মধ্যে শতপদী ও সহস্রপদী অন্তর্ভুক্ত। এই বিকল্প ব্যাখ্যা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, কারণ জীবাশ্মটির দেহ অসম্পূর্ণ। ফলে চোয়াল ও মাথার কিছু গঠন দেখে তার সম্পূর্ণ বিবর্তনীয় পরিচয় নির্ধারণ করা কঠিন। আগের গবেষণায় যে বৈশিষ্ট্যগুলিকে পোকামাকড়ের পরিচয়ের পক্ষে প্রমাণ হিসেবে দেখা হয়েছিল, সেগুলির ব্যাখ্যা নিয়েই মূলত মতভেদ তৈরি হয়।
এই বিতর্কের সমাধান খুঁজতে Natural History Museum-এর বিজ্ঞানীদের নেতৃত্বে একটি গবেষকদল জীবাশ্মটিকে অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতে পুনরায় পরীক্ষা করেন। গবেষণাটির প্রধান লেখক এমা জে. লং এবং সহলেখক গ্রেগরি ডি. এজকম্ব, মার্কুস কোখ ও জিয়াওয়া মা ব্যবহার করেন কনফোকাল লেজার স্ক্যানিং মাইক্রোস্কোপি (Confocal Laser Scanning Microscopy)। এই প্রযুক্তিতে কেন্দ্রীভূত লেজার আলো ব্যবহার করে নমুনার বিভিন্ন স্তরের ছবি সংগ্রহ করা হয়। পরে সেই তথ্য থেকে তৈরি করা যায় নমুনার ত্রিমাত্রিক ডিজিটাল মডেল। ফলে জীবাশ্মের অত্যন্ত ক্ষুদ্র গঠনগুলি আগের তুলনায় আরও বিস্তারিতভাবে পরীক্ষা করা সম্ভব হয়। বিশেষ করে চোয়ালের সংযোগস্থল এবং মুখোপাঙ্গের গঠন বিশ্লেষণে এই প্রযুক্তি গবেষকদের নতুন তথ্য দেয়।
নতুন গবেষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হল, Rhyniognatha-র চোয়ালে anterior mandibular acetabulum নামের একটি নির্দিষ্ট সংযোগস্থলের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এই গঠনটি চোয়ালের সামনের দিকের একটি সন্ধিবিন্দু, যা প্রকৃত dicondyly প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। Dicondyly বলতে চোয়ালের দুটি পৃথক সংযোগবিন্দুর মাধ্যমে মাথার সঙ্গে যুক্ত থাকার ব্যবস্থাকে বোঝায়। আধুনিক পোকামাকড়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিবর্তনীয় গোষ্ঠী Dicondylia-র বৈশিষ্ট্য নির্ধারণে এই গঠন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। Rhyniognatha-তে এই সামনের সংযোগস্থলের প্রমাণ না থাকায় একে Dicondylia গোষ্ঠীর সদস্য হিসেবে চিহ্নিত করার আগের যুক্তি দুর্বল হয়ে পড়েছে। এর ফলে একে আধুনিক উড়ন্ত পোকামাকড়ের বিবর্তনীয় শাখার প্রাচীন সদস্য হিসেবে গ্রহণ করার ভিত্তিও আর যথেষ্ট শক্তিশালী থাকছে না।
গবেষকেরা শতপদী হওয়ার আগের ধারণাটিও নতুন করে পরীক্ষা করেছেন। তাঁদের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, আগে শতপদীর বৈশিষ্ট্য বলে বিবেচিত কয়েকটি গঠন আসলে বহিঃকঙ্কালের ভাঁজ বা Exoskeletal folds হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। একই সঙ্গে চোয়ালে Myriapod গোষ্ঠীর বৈশিষ্ট্যপূর্ণ base plate-এরও স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ, জীবাশ্মটিকে শতপদী বলে নিশ্চিত করার জন্যও পর্যাপ্ত গঠনগত প্রমাণ নেই। এই পর্যবেক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ গবেষকেরা শুধু আগের পোকামাকড় পরিচয়কে প্রশ্নবিদ্ধ করেননি, বিকল্প হিসেবে প্রস্তাবিত শতপদী পরিচয়ের সীমাবদ্ধতাও তুলে ধরেছেন।
তাহলে Rhyniognatha আসলে কোন প্রাণীগোষ্ঠীর সদস্য? গবেষণায় কিছু বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে পাখাহীন Hexapoda এবং Myriapoda—উভয় গোষ্ঠীর সাদৃশ্য পাওয়া গেছে। Hexapoda বলতে ছয় পা-যুক্ত সন্ধিপদীদের বোঝায়, যার মধ্যে পোকামাকড়ও অন্তর্ভুক্ত। গবেষকেরা জীবাশ্মটির মুখোপাঙ্গে bifurcated maxillary endites এবং comb-like superlinguae নামের কিছু গঠন শনাক্ত করেছেন, যেগুলির সঙ্গে পাখাহীন Hexapoda-র বৈশিষ্ট্যের তুলনা করা যায়। অন্যদিকে, এর দীর্ঘ suspensorium-এর সঙ্গে কিছু Myriapod-এর গঠনগত সাদৃশ্য রয়েছে। Suspensorium হল এমন একটি গঠন, যা মুখোপাঙ্গকে মাথার সঙ্গে সংযুক্ত রাখতে সাহায্য করে। কিন্তু এই সাদৃশ্যগুলি কোনো একটি নির্দিষ্ট প্রাণীগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্তি প্রমাণ করার জন্য যথেষ্ট নয়। তাই গবেষকেরা Rhyniognatha-কে আপাতত কোনো নির্দিষ্ট সন্ধিপদী বংশধারার সদস্য হিসেবে চিহ্নিত করেননি।
এই সিদ্ধান্তের প্রভাব পড়েছে পোকামাকড়ের উড্ডয়নের বিবর্তনীয় সময়রেখায়। গত ২২ বছর ধরে Rhyniognatha-কে পোকামাকড়ের বিবর্তন এবং উড়তে সক্ষম পোকামাকড়ের আবির্ভাবের সময় নির্ধারণে একটি গুরুত্বপূর্ণ জীবাশ্ম হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। গবেষকেরা এখন বলছেন, এই জীবাশ্মকে আর পোকামাকড়ের বিবর্তনবৃক্ষের নির্ভরযোগ্য Calibration Fossil হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়। Calibration Fossil বলতে এমন জীবাশ্মকে বোঝায়, যার নির্দিষ্ট বয়স ও বিবর্তনীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে কোনো প্রাণীগোষ্ঠীর আবির্ভাবের ন্যূনতম সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়। Rhyniognatha-র পরিচয় অনিশ্চিত হয়ে পড়ায় আগের সেই সময়গত ভিত্তিও দুর্বল হয়ে গেছে।
গবেষণার প্রধান লেখক এমা লং-এর বক্তব্য অনুযায়ী, এর ফলে উড়ন্ত পোকামাকড়ের বিবর্তনের ন্যূনতম বয়সের হিসাব প্রায় ৮০ মিলিয়ন বছর বা আট কোটি বছর পরিবর্তিত হচ্ছে। তবে এই সংখ্যার অর্থ এই নয় যে নতুন গবেষণা উড়ন্ত পোকামাকড়ের প্রকৃত আবির্ভাবের নির্দিষ্ট তারিখ আবিষ্কার করেছে। গবেষণাটি কোনো নতুন উড়ন্ত পোকামাকড়ের জীবাশ্মও খুঁজে পায়নি। বরং এত দিন যে জীবাশ্মের ওপর নির্ভর করে সময়রেখা নির্ধারণ করা হচ্ছিল, সেটি সেই কাজে ব্যবহার করার উপযুক্ত নয় বলে দেখিয়েছে। ফলে পোকামাকড়ের উড্ডয়ন ঠিক কখন শুরু হয়েছিল, সেই প্রশ্নের উত্তর এখনও অমীমাংসিত। ভবিষ্যতে আরও নির্ভরযোগ্য জীবাশ্ম প্রমাণের ভিত্তিতে এই সময়কাল নির্ধারণ করতে হবে।
গবেষণার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, পুরোনো জাদুঘর সংগ্রহের বৈজ্ঞানিক মূল্য। গ্রেগরি এজকম্বের মতে, আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে বহু বছর আগে সংগৃহীত জীবাশ্মকে নতুন করে পরীক্ষা করলে এমন গঠনগত তথ্য পাওয়া সম্ভব, যা আগের প্রযুক্তিতে স্পষ্ট ছিল না। Rhyniognatha-র ক্ষেত্রেও ঠিক সেটাই ঘটেছে। ১৯২৬ সালে সংগৃহীত একটি ক্ষুদ্র জীবাশ্ম এক শতাব্দী পরেও নতুন বৈজ্ঞানিক প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে। ফলে প্রাকৃতিক ইতিহাসের জাদুঘরগুলির সংগ্রহ শুধু অতীতের নিদর্শন সংরক্ষণ করে না, ভবিষ্যতের গবেষণার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ তথ্যভান্ডার হিসেবে কাজ করে।
গবেষণাপত্রটি ২০২৬ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর Scientific Reports জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। এর শিরোনাম Morphology of the Devonian mandibulate arthropod Rhyniognatha and its implications for the timing of insect evolution। গবেষণাটির সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হল, এটি পোকামাকড়ের উড্ডয়নের নতুন কোনো চূড়ান্ত সময়সীমা নির্ধারণ করেনি; বরং বিবর্তনের ইতিহাস নির্মাণে ব্যবহৃত একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণের সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট করেছে। জীবাশ্মের পরিচয় নির্ধারণে সামান্য ভুলও কীভাবে বহু বছরের বৈজ্ঞানিক হিসাবকে প্রভাবিত করতে পারে, এই গবেষণা তার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। এখন বিজ্ঞানীদের সামনে প্রধান কাজ হল, আরও নির্ভরযোগ্য জীবাশ্মের সন্ধান ও পুনর্বিশ্লেষণের মাধ্যমে পোকামাকড়ের উড্ডয়নের প্রকৃত ইতিহাস পুনর্গঠন করা। এক শতাব্দী পুরোনো একটি জীবাশ্ম সেই অনুসন্ধানকে আবার নতুন করে শুরু করার সুযোগ তৈরি করেছে।
তথ্যসূত্র: Natural History Museum, Scientific Reports, ২০২৬; Long et al., DOI: 10.1038/s41598-026-70516-3.