সুপার এল নিনোর অশনিসংকেত: উত্তপ্ত পৃথিবীতে খাদ্যসংকট, দাবানল ও চরম আবহাওয়ার নতুন বিপদ
প্রচ্ছন্ন এক মহাসাগরীয় পরিবর্তন কীভাবে পৃথিবীর আবহাওয়া, কৃষি, খাদ্যনিরাপত্তা ও কোটি কোটি মানুষের জীবনকে বিপর্যস্ত করতে পারে, সেই আশঙ্কাই সামনে এনেছে El Niño-কে নিয়ে New Scientist-এর বিশেষ প্রতিবেদন।

পৃথিবীর জলবায়ু ব্যবস্থায় এমন কিছু পরিবর্তন ঘটে, যেগুলোর সূচনা হয় একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে, অথচ তার প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে। প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় অঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা এবং বায়ুপ্রবাহের পরিবর্তন তার অন্যতম উদাহরণ। El Niño নামে পরিচিত এই জলবায়ু পর্যায় দক্ষিণ আমেরিকার উপকূল থেকে শুরু করে এশিয়ার বর্ষা, আফ্রিকার কৃষি, অস্ট্রেলিয়ার দাবানল এবং বিশ্বের খাদ্যবাজার পর্যন্ত প্রভাব ফেলতে পারে। এই পরিবর্তনের তীব্রতা যখন অস্বাভাবিক মাত্রায় পৌঁছায়, তখন তার পরিণতি শুধু আবহাওয়ার অস্থিরতায় সীমাবদ্ধ থাকে না; তা অর্থনীতি, জনস্বাস্থ্য ও খাদ্যনিরাপত্তার জন্যও বড় পরীক্ষায় পরিণত হয়।
২০২৬ সালের ১৭ অক্টোবর প্রকাশিত New Scientist-এর বিশেষ প্রতিবেদন El Niño-র এই বহুমাত্রিক প্রভাবের দিকেই দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। প্রতিবেদনটিতে জলবায়ুবিজ্ঞানীদের বিশ্লেষণ, অতীতের ভয়াবহ ঘটনার অভিজ্ঞতা এবং ভবিষ্যতের সম্ভাব্য ঝুঁকি একসঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে। আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—মানবসৃষ্ট বৈশ্বিক উষ্ণায়নের মধ্যে একটি শক্তিশালী El Niño কতটা বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে, এবং তার প্রভাব মোকাবিলায় পৃথিবী কতটা প্রস্তুত?
El Niño-কে বোঝার জন্য প্রথমেই বুঝতে হবে প্রশান্ত মহাসাগরের সঙ্গে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের গভীর সম্পর্ক। সমুদ্র শুধু পৃথিবীর তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে না, এটি বিপুল পরিমাণ তাপ সঞ্চয় করে এবং বায়ুপ্রবাহের মাধ্যমে সেই শক্তির বণ্টনেও ভূমিকা রাখে। ফলে সমুদ্রের তাপমাত্রা ও সঞ্চিত তাপের অবস্থানে পরিবর্তন ঘটলে তার প্রতিক্রিয়া দেখা যায় বায়ুমণ্ডলের বৃহৎ সঞ্চালনব্যবস্থায়। এই পরিবর্তন পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টিপাত, খরা এবং ঝড়ের অনুকূল পরিস্থিতি বদলে দিতে পারে।
সাধারণ অবস্থায় প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় অঞ্চলে পূর্ব থেকে পশ্চিমে প্রবাহিত বাণিজ্যবায়ু উষ্ণ উপরিভাগের জলকে ইন্দোনেশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার দিকের পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে ঠেলে দেয়। অন্যদিকে দক্ষিণ আমেরিকার উপকূলের কাছে গভীর সমুদ্র থেকে তুলনামূলক ঠান্ডা জল উপরে উঠে আসে। এই ব্যবস্থার ফলে প্রশান্ত মহাসাগরের দুই প্রান্তে তাপমাত্রা ও বায়ুচাপের পার্থক্য তৈরি হয়, যা আঞ্চলিক বায়ুপ্রবাহকে সক্রিয় রাখে।
কিন্তু El Niño শুরু হলে এই স্বাভাবিক ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে। বাণিজ্যবায়ুর শক্তি কমে গেলে পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে জমে থাকা উষ্ণ জল পূর্বদিকে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। মধ্য ও পূর্ব নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বেড়ে যায় এবং সমুদ্র থেকে বায়ুমণ্ডলে তাপ ও জলীয় বাষ্পের আদানপ্রদান বদলে যায়। এর ফলে কোথাও বৃষ্টিপাত বাড়ে, কোথাও বৃষ্টির ঘাটতি তৈরি হয়, আবার কিছু অঞ্চলে তাপপ্রবাহ ও দাবানলের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়।
এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। El Niño গোটা পৃথিবীকে একইভাবে উষ্ণ করে না, কিংবা সর্বত্র বৃষ্টিপাত বাড়ায় না। বরং এটি পৃথিবীর আবহাওয়াব্যবস্থার প্রচলিত বিন্যাসকে বদলে দেয়। কোন অঞ্চলে তার কী প্রভাব পড়বে, তা নির্ভর করে সমুদ্রের তাপমাত্রা, বায়ুমণ্ডলের সঞ্চালন, ঋতু, স্থানীয় ভূপ্রকৃতি এবং অন্যান্য জলবায়ুগত অবস্থার ওপর। তাই El Niño-র প্রভাব বুঝতে হলে শুধু সমুদ্রের তাপমাত্রা নয়, সমগ্র জলবায়ুব্যবস্থার পারস্পরিক সম্পর্ক বিশ্লেষণ করতে হয়।
শক্তিশালী El Niño-র ক্ষেত্রে এই পরিবর্তন আরও তীব্র হতে পারে। সমুদ্রের উষ্ণতা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেলে বায়ুমণ্ডলে বিপুল পরিমাণ তাপ স্থানান্তরিত হয়। এর প্রভাব বিভিন্ন অঞ্চলে ভিন্নভাবে প্রকাশ পায়, কিন্তু সামগ্রিকভাবে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বাড়ার প্রবণতা জোরদার হয়। বর্তমান পরিস্থিতিতে উদ্বেগের কারণ হলো, এই প্রাকৃতিক উষ্ণায়ন এমন এক পৃথিবীতে ঘটছে, যার গড় তাপমাত্রা ইতিমধ্যেই গ্রিনহাউস গ্যাসের কারণে বেড়ে গেছে।
মানবসৃষ্ট বৈশ্বিক উষ্ণায়ন এবং El Niño-র প্রভাব এক নয়। বৈশ্বিক উষ্ণায়ন দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ুগত পরিবর্তন, যার প্রধান চালক জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানো, বন ধ্বংস এবং অন্যান্য মানবসৃষ্ট গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ। অন্যদিকে El Niño হলো প্রশান্ত মহাসাগরকেন্দ্রিক প্রাকৃতিক জলবায়ু চক্রের একটি উষ্ণ পর্যায়। তবে দুটি প্রক্রিয়া একই সময়ে সক্রিয় থাকলে তাদের প্রভাব পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তাপমাত্রার নতুন রেকর্ড তৈরি করতে পারে। এই কারণেই শক্তিশালী El Niño-র বছরগুলোতে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের তাৎক্ষণিক প্রভাব বিশেষভাবে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
New Scientist-এর প্রতিবেদনে আলোচিত পূর্বাভাস অনুযায়ী, বর্তমান শক্তিশালী El Niño ২০২৬ সালের শেষভাগে সর্বোচ্চ তীব্রতায় পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে। এর তাপমাত্রাগত প্রভাব ২০২৭ সালেও অব্যাহত থাকতে পারে, কারণ সমুদ্র থেকে বায়ুমণ্ডলে স্থানান্তরিত তাপের প্রভাব সঙ্গে সঙ্গে শেষ হয় না। তবে El Niño-র প্রকৃত তীব্রতা, স্থায়িত্ব এবং পরবর্তী আবহাওয়াগত প্রতিক্রিয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। তাই নির্দিষ্ট সময়ের আবহাওয়াগত বিপর্যয়কে নিশ্চিত ঘটনা হিসেবে না দেখে সম্ভাব্য ঝুঁকি হিসেবে মূল্যায়ন করাই বৈজ্ঞানিকভাবে যথাযথ।
এই পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় বিপদগুলোর একটি হলো পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে একসঙ্গে একাধিক চরম আবহাওয়াগত ঘটনা ঘটার আশঙ্কা। কোথাও দীর্ঘস্থায়ী খরা কৃষিজমিকে অনুর্বর করে তুলতে পারে, কোথাও অতিবৃষ্টি ও বন্যা ফসল নষ্ট করতে পারে, আবার অন্য কোথাও দাবানল বনভূমি ও বসতিকে বিপন্ন করতে পারে। পৃথকভাবে প্রতিটি বিপর্যয় মোকাবিলা করা কঠিন, কিন্তু একাধিক অঞ্চলে একই সময়ে ক্ষয়ক্ষতি হলে আন্তর্জাতিক সাহায্য, খাদ্য সরবরাহ এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর চাপ বহুগুণ বেড়ে যায়।
ইন্দোনেশিয়ার দাবানল এই বিপদের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। El Niño-র সঙ্গে সম্পর্কিত শুষ্ক আবহাওয়া এবং উচ্চ তাপমাত্রা বন ও পিটভূমিকে সহজে দাহ্য করে তুলতে পারে। আগুন একবার ছড়িয়ে পড়লে তা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে যায়, বিশেষ করে পিটভূমির গভীরে আগুন প্রবেশ করলে। এই ধরনের দাবানল থেকে নির্গত ধোঁয়া ও সূক্ষ্ম কণা মানুষের শ্বাসযন্ত্রের ক্ষতি করে, পরিবেশের ওপর চাপ সৃষ্টি করে এবং বিপুল পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইড বায়ুমণ্ডলে ফিরিয়ে দেয়। ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে লড়াই আরও কঠিন হয়ে ওঠে।
অন্যদিকে অতিবৃষ্টি ও বন্যার বিপদও সমান গুরুত্বপূর্ণ। El Niño-র কারণে কিছু অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের ধরন বদলে গিয়ে অল্প সময়ে বিপুল পরিমাণ বৃষ্টি হতে পারে। এতে নদীর জলস্তর দ্রুত বেড়ে যায়, ভূমিধসের ঝুঁকি বাড়ে এবং সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎব্যবস্থা ও কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিশেষত পাহাড়ি এলাকায় অতিবৃষ্টি ও ভূমিধস একসঙ্গে ঘটলে উদ্ধারকাজ এবং যোগাযোগব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। ফলে জলবায়ুগত বিপর্যয়ের প্রভাব শুধু প্রাকৃতিক পরিবেশে নয়, মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও ছড়িয়ে পড়ে।

El Niño-র সবচেয়ে বড় পরীক্ষা: খাদ্যনিরাপত্তা ও মানবসভ্যতার প্রস্তুতি
El Niño-র প্রভাবের সবচেয়ে গভীর দিকগুলোর একটি হলো বিশ্বজুড়ে খাদ্য উৎপাদনের ওপর তার সম্ভাব্য আঘাত। আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি অনেক উন্নত হলেও অধিকাংশ ফসল এখনও তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত, মাটির আর্দ্রতা এবং ঋতুচক্রের ওপর নির্ভরশীল। বপন থেকে ফসল কাটা পর্যন্ত নির্দিষ্ট সময়ে জল ও উপযুক্ত তাপমাত্রা না পেলে উৎপাদন কমে যায়। অতিরিক্ত তাপ ফুল ও শস্যদানা গঠনে বাধা সৃষ্টি করতে পারে, আবার দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা শিকড়ের ক্ষতি করে এবং ফসলের রোগ বাড়ায়।
ভারতের ক্ষেত্রে বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দেশের কৃষির একটি বড় অংশ মৌসুমি বৃষ্টির ওপর নির্ভরশীল। El Niño-র সঙ্গে ভারতীয় গ্রীষ্মকালীন মৌসুমি বায়ুর দুর্বলতার সম্পর্ক বহু গবেষণায় আলোচিত হয়েছে। তবে প্রতিটি El Niño-তেই ভারতের সর্বত্র কম বৃষ্টি হয়, এমন নয়। ভারত মহাসাগরের তাপমাত্রা, ভারত মহাসাগরীয় দ্বিমেরু পরিবর্তন, বায়ুমণ্ডলের অভ্যন্তরীণ ওঠানামা এবং মৌসুমি বায়ুর অন্যান্য বৈশিষ্ট্যও বৃষ্টিপাত নির্ধারণ করে। তা সত্ত্বেও শক্তিশালী El Niño-র সময় খরা এবং বৃষ্টির অনিয়মিত বণ্টনের ঝুঁকি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
ধান ভারতের খাদ্যব্যবস্থার অন্যতম প্রধান ভিত্তি। ধানের চারা রোপণ, বৃদ্ধি ও শস্যদানা গঠনের বিভিন্ন পর্যায়ে পর্যাপ্ত জল প্রয়োজন। মৌসুমি বৃষ্টির ঘাটতি হলে সেচের ওপর নির্ভরতা বেড়ে যায়, ভূগর্ভস্থ জলের ব্যবহার বাড়ে এবং কৃষকের উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পায়। অন্যদিকে অতিরিক্ত তাপমাত্রা ধানের ফুল ফোটা ও পরাগায়নের সময় ক্ষতি করতে পারে। ফলে বৃষ্টির ঘাটতি না থাকলেও তাপপ্রবাহের কারণে ফলন কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। গমের ক্ষেত্রেও শস্যদানা গঠনের সময় অতিরিক্ত তাপ দ্রুত পরিপক্বতা ঘটিয়ে ফলন কমাতে পারে।
New Scientist-এর বিশেষ প্রতিবেদনে আলোচিত খাদ্যসংকটের আশঙ্কা শুধু কৃষিজমিতে ফসল কমে যাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিশ্ববাজারে খাদ্য সরবরাহের ব্যবস্থাও অত্যন্ত আন্তর্নির্ভরশীল। একাধিক প্রধান উৎপাদক দেশে একই সময়ে খরা, বন্যা বা অতিরিক্ত তাপের কারণে উৎপাদন কমে গেলে বাজারে সরবরাহ সংকুচিত হয়। তখন চাল, গম, ভুট্টা, কফি, কোকো এবং অন্যান্য কৃষিপণ্যের দাম বেড়ে যেতে পারে। কৃষিপণ্যের ঘাটতি পশুখাদ্য, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ এবং পরিবহণ খরচের ওপরও প্রভাব ফেলে। এই পরিস্থিতিতে খাদ্যমূল্যের বৃদ্ধি এক পণ্য থেকে অন্য পণ্যে ছড়িয়ে পড়ে।
সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়ে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো। যেসব পরিবার তাদের আয়ের বড় অংশ খাদ্য কেনার পেছনে ব্যয় করে, তাদের জন্য সামান্য মূল্যবৃদ্ধিও গুরুতর সংকট তৈরি করে। খাবারের পরিমাণ কমানো, পুষ্টিকর খাবারের বদলে সস্তা খাবার বেছে নেওয়া এবং স্বাস্থ্য ও শিক্ষার মতো প্রয়োজনীয় খরচ কমিয়ে দেওয়ার প্রবণতা বাড়ে। কোনো অঞ্চলে উৎপাদন বিপর্যয় দীর্ঘস্থায়ী হলে অপুষ্টি, ঋণগ্রস্ততা, কর্মসংস্থানের সংকট এবং বাধ্যতামূলক অভিবাসনের ঝুঁকিও বাড়তে পারে। অর্থাৎ খাদ্যসংকট শুধু কৃষির সমস্যা নয়; এটি দারিদ্র্য, সামাজিক বৈষম্য ও জনস্বাস্থ্যের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।
আফ্রিকার কিছু অঞ্চলে এই বিপদ আরও জটিল। পূর্ব ও দক্ষিণ আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, দীর্ঘস্থায়ী খরা এবং কৃষি উৎপাদনের ওপর নির্ভরশীল জীবিকার কারণে খাদ্যসংকট দ্রুত তীব্র হতে পারে। পশ্চিম আফ্রিকার কিছু দেশ আবার আমদানিনির্ভর খাদ্য সরবরাহের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কা অনুভব করে। একই সঙ্গে সংঘাত, দুর্বল পরিবহণব্যবস্থা, স্থানীয় প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতা এবং মানবিক সাহায্যের ঘাটতি পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তোলে। ফলে একই মাত্রার আবহাওয়াগত বিপর্যয় একটি দেশে সাময়িক অর্থনৈতিক সমস্যা তৈরি করলেও অন্য দেশে তা দুর্ভিক্ষের ঝুঁকিতে পরিণত হতে পারে।
ইতিহাস এই আশঙ্কার ভয়াবহতা বুঝতে সাহায্য করে। ১৮৭৬ থেকে ১৮৭৯ সালের মধ্যে ভারত, চীন, ব্রাজিলসহ বিভিন্ন অঞ্চলে খরা, ফসলহানি এবং দুর্ভিক্ষে বিপুলসংখ্যক মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। এই বিপর্যয়ের সঙ্গে শক্তিশালী El Niño-সম্পর্কিত জলবায়ুগত পরিস্থিতির গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে বলে ইতিহাসবিদ ও জলবায়ু গবেষকেরা আলোচনা করেছেন। মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট সংখ্যা নিয়ে ঐতিহাসিক অনুমানে পার্থক্য রয়েছে, তবে ঘটনাটি যে ঊনবিংশ শতাব্দীর অন্যতম ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় ছিল, তা নিয়ে সন্দেহ নেই।
সেই সময় আবহাওয়ার পূর্বাভাস, কৃষি প্রযুক্তি, পরিবহণ এবং জরুরি খাদ্য সরবরাহের ব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত সীমিত। কোথায় ফসল নষ্ট হচ্ছে এবং কোথায় খাদ্যের প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি, তা দ্রুত বোঝা কঠিন ছিল। ঔপনিবেশিক প্রশাসনের নীতি, খাদ্যশস্যের বণ্টনব্যবস্থা এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতার অভাবও বহু অঞ্চলে সংকট বাড়িয়েছিল। এই ইতিহাস মনে করিয়ে দেয়, প্রাকৃতিক বিপর্যয় নিজে থেকেই সব মৃত্যুর কারণ হয়ে ওঠে না; মানুষের সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা সেই বিপর্যয়ের পরিণতি কতটা ভয়াবহ হবে, তা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
আজকের পৃথিবী ঊনবিংশ শতাব্দীর তুলনায় অনেক বেশি প্রস্তুত। উপগ্রহ পর্যবেক্ষণ, আবহাওয়ার সংখ্যাতাত্ত্বিক মডেল, উন্নত সমুদ্রবিজ্ঞান, আন্তর্জাতিক খাদ্যবাণিজ্য এবং দ্রুত যোগাযোগব্যবস্থা বিপদের আগাম সংকেত শনাক্ত করার সুযোগ তৈরি করেছে। তবু প্রস্তুতির এই সুবিধা সব দেশের মানুষের কাছে সমানভাবে পৌঁছায় না। খাদ্য আমদানির জন্য পর্যাপ্ত বৈদেশিক মুদ্রা না থাকা, কৃষকের ঋণ পাওয়ার সীমাবদ্ধতা, দুর্বল সরকারি মজুতব্যবস্থা এবং পরিবহণের সমস্যা আগাম সতর্কবার্তাকে কার্যকর পদক্ষেপে রূপান্তরিত হতে বাধা দেয়।
এখানেই আগাম পূর্বাভাসের প্রকৃত মূল্য। বিপর্যয়ের কয়েক মাস আগে সম্ভাব্য খরা শনাক্ত করা গেলে কৃষক কম জল প্রয়োজন এমন ফসল বেছে নিতে পারেন, বপনের সময় পরিবর্তন করতে পারেন এবং সেচের পরিকল্পনা নতুনভাবে সাজাতে পারেন। সরকার খাদ্যশস্যের মজুত বাড়ানো, প্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানির ব্যবস্থা করা এবং ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলে আর্থিক সহায়তা প্রস্তুত রাখার সুযোগ পায়। একইভাবে দাবানলের ঝুঁকি বেশি এমন এলাকায় আগুন নিয়ন্ত্রণের সরঞ্জাম ও কর্মী আগে থেকেই মোতায়েন করা যায়। পূর্বাভাসের সুবিধা তখনই বাস্তব ফল দেয়, যখন সতর্কবার্তা যথাসময়ে মানুষের কাছে পৌঁছায় এবং তা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার অর্থ ও পরিকাঠামো থাকে।
জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে El Niño-র সম্পর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো চরম আবহাওয়ার ক্ষয়ক্ষতি বৃদ্ধি। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে বায়ুমণ্ডল উষ্ণ হলে তা সাধারণত বেশি জলীয় বাষ্প ধারণ করতে পারে। ফলে উপযুক্ত আবহাওয়াগত পরিস্থিতিতে অতিবৃষ্টির তীব্রতা বাড়ার সুযোগ তৈরি হয়। অন্যদিকে তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে মাটি ও উদ্ভিদ থেকে জল হারানোর হার বাড়তে পারে, যা কিছু অঞ্চলে খরার প্রভাবকে তীব্র করে। তবে এই পরিবর্তন সব জায়গায় একই রকম নয়; আঞ্চলিক বৃষ্টিপাতের ধরন, বায়ুপ্রবাহ এবং ভূমির বৈশিষ্ট্যও গুরুত্বপূর্ণ।
দাবানল, খরা এবং বন্যার প্রভাব আবার একে অপরকে শক্তিশালী করতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী খরায় উদ্ভিদ শুকিয়ে গেলে আগুন ছড়িয়ে পড়ার উপযোগী জ্বালানি তৈরি হয়। দাবানল উদ্ভিদের আচ্ছাদন নষ্ট করলে মাটির ক্ষয় বাড়তে পারে এবং পরবর্তী ভারী বৃষ্টিতে ভূমিধস বা আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি বৃদ্ধি পেতে পারে। বন ধ্বংসের কারণে মাটির জলধারণক্ষমতা এবং স্থানীয় বাস্তুতন্ত্রের স্থিতিশীলতাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই ধরনের ধারাবাহিক বিপর্যয়কে আলাদা আলাদা ঘটনা হিসেবে দেখলে প্রকৃত ঝুঁকির মাত্রা বোঝা কঠিন।
সমুদ্রের বাস্তুতন্ত্রও El Niño-র প্রভাবে বিপর্যস্ত হয়। স্বাভাবিক অবস্থায় দক্ষিণ আমেরিকার উপকূলসহ প্রশান্ত মহাসাগরের কিছু অঞ্চলে গভীর সমুদ্রের ঠান্ডা, পুষ্টিসমৃদ্ধ জল উপরে উঠে আসে। এই প্রক্রিয়াকে আপওয়েলিং বলা হয়। এর ফলে ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটনের বৃদ্ধি ঘটে, যা সামুদ্রিক খাদ্যশৃঙ্খলের ভিত্তি। El Niño-র সময় সমুদ্রের উপরিভাগ উষ্ণ হলে এই প্রক্রিয়া দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। পুষ্টি উপাদানের সরবরাহ কমে গেলে মাছের খাদ্যভিত্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং মৎস্যসম্পদের উৎপাদন কমে যেতে পারে। যেসব উপকূলীয় জনগোষ্ঠী মাছ ধরার ওপর নির্ভরশীল, তাদের জীবিকায় এর সরাসরি প্রভাব পড়ে।
প্রবালপ্রাচীরের জন্যও অতিরিক্ত সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা গুরুতর বিপদ। প্রবাল তাদের টিস্যুতে বসবাসকারী সহাবস্থানকারী শৈবালের কাছ থেকে খাদ্য ও শক্তির বড় অংশ পায়। দীর্ঘ সময় ধরে তাপমাত্রা স্বাভাবিক সীমার বাইরে থাকলে এই সম্পর্ক ভেঙে যায় এবং প্রবাল শৈবালকে বের করে দেয়। ফলে প্রবাল সাদা হয়ে যায়, যে ঘটনাকে প্রবাল বিবর্ণতা বা coral bleaching বলা হয়। তাপের চাপ দীর্ঘস্থায়ী হলে প্রবাল মারা যেতে পারে। এতে সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য, মৎস্যসম্পদ, পর্যটন এবং উপকূলীয় সুরক্ষা—সবকিছুই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
El Niño-র প্রভাবে প্রবাল বিবর্ণতার ঘটনা আগেও ঘটেছে। কিন্তু বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে সমুদ্রের গড় তাপমাত্রা বাড়তে থাকায় প্রবালপ্রাচীরের পুনরুদ্ধারের জন্য প্রয়োজনীয় বিরতিও সংকুচিত হচ্ছে। একটি বিবর্ণতার ঘটনার পর প্রবালপ্রাচীর পুনরায় সুস্থ হওয়ার আগেই আরেকটি তাপপ্রবাহ আঘাত হানলে ক্ষতি দীর্ঘস্থায়ী হয়ে উঠতে পারে। তাই প্রবাল সংরক্ষণের ক্ষেত্রে শুধু একটি তাপপ্রবাহ মোকাবিলা নয়, সমুদ্রের দীর্ঘমেয়াদি উষ্ণায়ন কমানোও অপরিহার্য।
এই বিপুল ঝুঁকির মুখে বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন প্রযুক্তিগত সমাধান নিয়ে কাজ করছেন। New Scientist-এর প্রতিবেদনে এমন কিছু ধারণার উল্লেখ রয়েছে, যেগুলোর লক্ষ্য El Niño-র প্রভাব কমানো অথবা তার ক্ষতির বিরুদ্ধে প্রকৃতি ও মানবসমাজকে আরও সহনশীল করে তোলা। তবে এসব সমাধানের মধ্যে কিছু ইতিমধ্যেই বাস্তবে ব্যবহৃত হচ্ছে, কিছু পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে এবং কিছু এখনও ধারণাগত পর্যায়ে। এগুলোর কার্যকারিতা, ব্যয়, পরিবেশগত প্রভাব এবং বৃহৎ পরিসরে প্রয়োগের বাস্তবতা আলাদা করে বিচার করা প্রয়োজন।
প্রস্তাবিত একটি ধারণা হলো কৃত্রিম আপওয়েলিং। এর উদ্দেশ্য গভীর সমুদ্রের ঠান্ডা, পুষ্টিসমৃদ্ধ জলকে পাইপ বা অন্য যান্ত্রিক ব্যবস্থার সাহায্যে উপরে তুলে আনা। তাত্ত্বিকভাবে এতে সমুদ্রের উপরিভাগের তাপমাত্রা কমানো এবং ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটনের বৃদ্ধি বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। কিন্তু প্রশান্ত মহাসাগরের বিশাল এলাকায় এই পদ্ধতি প্রয়োগ করতে হলে বিপুল পরিকাঠামো, শক্তি এবং অর্থের প্রয়োজন হবে। গভীর সমুদ্রের জল উপরে তোলার ফলে স্থানীয় বাস্তুতন্ত্রে কী পরিবর্তন ঘটবে, কতটা এলাকায় কার্যকর শীতলীকরণ সম্ভব হবে এবং তার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কী হতে পারে—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনও যথেষ্ট স্পষ্ট নয়।
আরেকটি আলোচিত ধারণা হলো marine cloud brightening বা সামুদ্রিক মেঘের প্রতিফলনক্ষমতা বৃদ্ধি। এই পদ্ধতিতে সমুদ্রের ওপরের কিছু নিম্নস্তরের মেঘে ক্ষুদ্র জলকণা বা লবণকণার সংখ্যা বাড়িয়ে মেঘকে তুলনামূলক উজ্জ্বল করার চেষ্টা করা হয়। তাত্ত্বিকভাবে উজ্জ্বল মেঘ বেশি সূর্যালোক মহাকাশে প্রতিফলিত করতে পারে, ফলে সমুদ্রের উপরিভাগে শোষিত সৌরশক্তি কমে যায়। কিন্তু বাস্তব পরিবেশে মেঘের গঠন, স্থায়িত্ব এবং প্রতিফলনক্ষমতা অনেকগুলো বিষয়ের ওপর নির্ভরশীল। বৃহৎ পরিসরে এই প্রযুক্তি প্রয়োগ করলে আঞ্চলিক বৃষ্টিপাত, বায়ুপ্রবাহ এবং বাস্তুতন্ত্রে কী প্রভাব পড়বে, তা নির্ভরযোগ্যভাবে নির্ধারণ করা এখনও কঠিন।
জলবায়ু প্রকৌশলের এই ধরনের ধারণা নিয়ে সতর্কতা প্রয়োজন, কারণ একটি অঞ্চলে তাপমাত্রা কমানোর চেষ্টা অন্য অঞ্চলের আবহাওয়ায় অনাকাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন ঘটাতে পারে। এর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের নিয়ম এবং সম্ভাব্য ক্ষতির দায় নির্ধারণের প্রশ্নও রয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা, কৃত্রিমভাবে সমুদ্র বা মেঘের বৈশিষ্ট্য পরিবর্তন করার প্রযুক্তি গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমানোর বিকল্প নয়। বরং এ ধরনের গবেষণার পাশাপাশি জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমানো, পরিচ্ছন্ন শক্তির প্রসার এবং বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধারকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
অন্যদিকে কৃষিতে অভিযোজনের কিছু উপায় অনেক বেশি বাস্তবসম্মত। তাপসহনশীল ও খরাসহনশীল ফসলের জাত তৈরি, বীজের বৈচিত্র্য বৃদ্ধি, উন্নত সেচব্যবস্থা এবং মাটির আর্দ্রতা সংরক্ষণ কৃষিকে জলবায়ুর ধাক্কা সামলাতে সাহায্য করতে পারে। ধানের ক্ষেত্রে এমন জাত নিয়ে গবেষণা চলছে, যেগুলো উচ্চ তাপমাত্রা বা বন্যার মতো প্রতিকূল অবস্থাতেও তুলনামূলক ভালো ফলন দিতে পারে। জিন সম্পাদনা ও নির্বাচিত প্রজননের মাধ্যমে ফসলের সহনশীল বৈশিষ্ট্য উন্নত করার সুযোগ রয়েছে। তবে পরীক্ষাগারে ভালো ফল পাওয়া আর বিভিন্ন দেশের মাঠপর্যায়ে একই ফল অর্জন করা এক বিষয় নয়। স্থানীয় মাটি, আবহাওয়া, রোগবালাই এবং কৃষকের চাষের পদ্ধতি বিবেচনায় রেখে এসব জাতের পরীক্ষা ও মূল্যায়ন প্রয়োজন।
উপকূলীয় অঞ্চলে বন্যা মোকাবিলার ক্ষেত্রেও একই ধরনের সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গি দরকার। বাঁধ, জলনিকাশির উন্নয়ন এবং বন্যা প্রতিরোধী অবকাঠামো বসতি ও কৃষিজমিকে সুরক্ষা দিতে পারে। কিন্তু কেবল কংক্রিটের দেওয়াল বা উঁচু বাঁধের ওপর নির্ভর করলে অনেক ক্ষেত্রে ঝুঁকি অন্য এলাকায় স্থানান্তরিত হয়। জলাভূমি পুনরুদ্ধার, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহের জন্য জায়গা রাখা, উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্র রক্ষা এবং পরিকল্পিত নগরায়ণ দীর্ঘমেয়াদে আরও কার্যকর সুরক্ষা দিতে পারে। প্রকৃতিনির্ভর সমাধান ও আধুনিক প্রকৌশলের সমন্বয় দুর্যোগের ক্ষতি কমানোর গুরুত্বপূর্ণ পথ।
El Niño-র আরেকটি শিক্ষা হলো, বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় শুধু প্রযুক্তি যথেষ্ট নয়। বিজ্ঞানীরা যদি কয়েক মাস আগে সম্ভাব্য বিপদের পূর্বাভাসও দেন, কিন্তু সরকার খাদ্য মজুত, কৃষি সহায়তা, স্বাস্থ্য পরিষেবা এবং জরুরি তহবিল প্রস্তুত না রাখে, তাহলে আগাম সতর্কতার সুফল সীমিত হয়ে পড়ে। একইভাবে কৃষকের কাছে যদি খরা-সহনশীল বীজ বা সেচের সুবিধা না থাকে, তবে জলবায়ু সম্পর্কে সঠিক তথ্য পেয়েও তিনি প্রয়োজনীয় পরিবর্তন করতে পারবেন না। তাই বিজ্ঞানভিত্তিক পূর্বাভাসের সঙ্গে অর্থনৈতিক সহায়তা, সামাজিক সুরক্ষা এবং কার্যকর প্রশাসনিক পরিকল্পনার সংযোগ অপরিহার্য।
বর্তমান বিশ্বের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো একাধিক সংকটের সম্মিলিত প্রভাব মোকাবিলা করা। খাদ্যমূল্য বৃদ্ধির সঙ্গে জ্বালানি ও সার আমদানির খরচ বাড়লে কৃষি উৎপাদন আরও ব্যয়বহুল হয়। যুদ্ধ বা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাধা তৈরি হলে খাদ্য সরবরাহের বিকল্প পথ খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। একই সময়ে বন্যা বা খরা পরিবহণব্যবস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করলে বাজারে পণ্য পৌঁছানোর খরচ বাড়ে। ফলে El Niño-র মতো প্রাকৃতিক জলবায়ু ঘটনা এমন এক বিশ্বে আঘাত হানে, যেখানে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা তার ক্ষতিকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে দেশগুলোর খাদ্যনিরাপত্তা পরিকল্পনায় স্থানীয় উৎপাদনের পাশাপাশি বহুমুখী সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। একটি বা দুটি প্রধান খাদ্যশস্য কিংবা অল্প কয়েকটি উৎপাদক দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা বিপজ্জনক। কৌশলগত খাদ্য মজুত, বিভিন্ন উৎস থেকে আমদানির ব্যবস্থা, কৃষকের জন্য ফসলবিমা এবং জরুরি আর্থিক সহায়তা দুর্যোগের ধাক্কা কমাতে পারে। একই সঙ্গে অপচয় কমানো এবং খাদ্য সংরক্ষণের উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করলে উৎপাদন কমে যাওয়ার সময়ও সরবরাহের একটি অংশ বজায় রাখা সম্ভব।
El Niño-র পূর্বাভাসের ক্ষেত্রেও বিজ্ঞান অনেক এগিয়েছে, কিন্তু অনিশ্চয়তা এখনও রয়ে গেছে। সমুদ্রের তাপমাত্রা, বায়ুপ্রবাহ এবং সমুদ্রের নিচে তাপের বণ্টন পর্যবেক্ষণ করে বিজ্ঞানীরা কয়েক মাস আগে এই জলবায়ু পর্যায়ের বিকাশ সম্পর্কে ধারণা পান। তবু নির্দিষ্ট সময়ে এর তীব্রতা কত হবে, কত দিন স্থায়ী হবে এবং কোন অঞ্চলে কী ধরনের প্রভাব ফেলবে, তা নিখুঁতভাবে বলা যায় না। দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে এই প্রাকৃতিক চক্রের সম্পর্কও জটিল। তাই পূর্বাভাসকে নিশ্চিত ভবিষ্যদ্বাণী হিসেবে নয়, ঝুঁকি কমানোর পরিকল্পনা তৈরির বৈজ্ঞানিক উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করা উচিত।
সবশেষে, El Niño-কে কেবল একটি সাময়িক আবহাওয়াগত ঘটনা হিসেবে দেখলে তার প্রকৃত গুরুত্ব বোঝা যাবে না। এটি পৃথিবীর সমুদ্র, বায়ুমণ্ডল, কৃষি, বাস্তুতন্ত্র এবং মানবসমাজের গভীর আন্তর্নির্ভরতার কথা মনে করিয়ে দেয়। প্রশান্ত মহাসাগরে শুরু হওয়া পরিবর্তন হাজার হাজার কিলোমিটার দূরের কৃষকের ফসল, শহরের খাদ্যমূল্য কিংবা একটি প্রবালপ্রাচীরের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু সেই প্রভাব কতটা ভয়াবহ হবে, তা শুধু সমুদ্রের তাপমাত্রা দিয়ে নির্ধারিত হয় না; আমাদের প্রস্তুতি, সম্পদের বণ্টন এবং পরিবেশের প্রতি দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
New Scientist-এর বিশেষ প্রতিবেদনটির সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ শিক্ষা এখানেই—প্রাকৃতিক জলবায়ু চক্রকে বন্ধ করা মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়, কিন্তু তার ক্ষতি কমানোর জন্য আগাম প্রস্তুতি নেওয়া সম্ভব। নির্ভরযোগ্য পূর্বাভাস, জলবায়ু-সহনশীল কৃষি, কার্যকর খাদ্য মজুত, শক্তিশালী জনস্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং কার্বন নিঃসরণ হ্রাস—এই পদক্ষেপগুলো একসঙ্গে এগিয়ে নিতে হবে। সুপার El Niño-র সম্ভাব্য বিপদ আমাদের সামনে সেই প্রশ্নই তুলে ধরছে: সংকটের অপেক্ষায় থাকব, নাকি বিজ্ঞান ও দূরদর্শিতাকে কাজে লাগিয়ে আগেই প্রস্তুত হব?
সূত্র: New Scientist, Special Report: El Niño, ১৭ অক্টোবর ২০২৬।